বিশ্বকাপে বারবার থাবা বসিয়েছে রাজনীতি। কখনও যুদ্ধ, কখনও শাসকের আস্ফালন, কখনও শাসকের মরণকামড়ের সামনে ফুটবলারদের নতিস্বীকার- ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ বারবারই রক্তাক্ত হয়েছে। যদিও শেষ বাঁশি বাজার পর জিতেছে ফুটবল, তবু ইতিহাসের পাতায় আজও রয়ে গিয়েছে ভয় ধরানো ঘটনাবলি। সেরকমই প্রবল এক নৃশংসতার সাক্ষী থেকেছিল ১৯৩৮ বিশ্বকাপ। আরও বহু অত্যাচারের মতোই এই ভয়ংকর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে অ্যাডলফ হিটলারের নাম।
১৯৩৮। বিশ্বের ইতিহাসে তখন টালমাটাল সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত সামলে ওঠার সময়টুকু মেলেনি, কিন্তু শোনা যাচ্ছে আরও এক বিশ্বযুদ্ধের ভারী বুটের শব্দ। ইউরোপের আকাশে একটু একটু করে বাড়ছে বারুদের গন্ধ, তার মধ্যেই এসে গেল বিশ্বকাপ। একবুক স্বপ্ন নিয়ে মেগা টুর্নামেন্টে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে অস্ট্রিয়া। কিন্তু ছোট্ট দেশটির জানা ছিল না, তাদের উপর এসে পড়বে আগ্রাসী হিটলারের থাবা! অস্ট্রিয়ার প্রতি জার্মান একনায়কের ঘৃণার কাহিনী সর্বজনবিদিত। খেলার মাঠটাই বা তার ব্যতিক্রম হবে কী করে?
১৯৩৬ সালে জার্মানিতে বসেছিল দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের আসর। সেই অলিম্পিকে অস্ট্রিয়ার বাড়াবাড়ি একেবারে সহ্য হয়নি হিটলারের। 'বিশুদ্ধ আর্য' রক্তে ভরপুর জার্মান ব্রিগেড বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনালে। আর ফ্যুয়েরারের চোখের বালি অস্ট্রিয়া কিনা খেলছে ফাইনাল! শেষ পর্যন্ত রুপো জেতে অস্ট্রিয়া। রাগ বাড়তে থাকে হিটলারের। তাদের ফুটবল খেলার স্বপ্ন সম্ভবত চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার সংকল্প করে ফেলেছিলেন। সেটারই ফলশ্রুতি দু'বছর পরে। বিশ্বকাপের ইতিহাস থেকে মুছে গেল অস্ট্রিয়ার নাম।
ফুটবল টিম তখন হিটলারের হাতের পুতুল। প্রথমেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হল ইহুদি ফুটবলারদের। তাঁদের কাউকে তাড়ানো হল দেশ থেকে, কাউকে ভরে দেওয়া হল কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে।
অস্ট্রিয়াকে জোর করে জার্মান বুটের তলায় আনতে হবে, সেটাই ছিল হিটলারের নির্দেশ। তার মূল কারণ, অস্ট্রিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতির দখল নেওয়া। বহু আলোচনা, দর কষাকষি-কিছুই গ্রাহ্য করেননি হিটলার। ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ল জার্মান সেনা। জার্মানির সঙ্গে মিশে গেল অস্ট্রিয়া, ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হল আনশলুস অধ্যায়। যদিও অস্ট্রিয়ার আমজনতার অনেকেই খুশি ছিল বৃহত্তর জার্মান সাম্রাজ্যের অংশ হতে পেরে। কিন্তু সেসময় হয়তো তাঁদের ধারণা ছিল না, জার্মান সাম্রাজ্যকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কী কী মূল্য চোকাতে হতে পারে।
জার্মান বুট অস্ট্রিয়ার ভূমিতে পড়ামাত্রই শেষ হয়ে গেল দেশটির নিজস্বতা। ফুটবল বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার পতাকা বুকে আটকে খেলার স্বপ্নেও ইতি। ফুটবল টিম তখন হিটলারের হাতের পুতুল। প্রথমেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হল ইহুদি ফুটবলারদের। তাঁদের কাউকে তাড়ানো হল দেশ থেকে, কাউকে ভরে দেওয়া হল কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। তবে অস্ট্রিয়ার 'বিশুদ্ধ আর্য' ফুটবলারদের বেছে নিয়ে জার্মান ব্রিগেডে ঢুকিয়ে দিল হিটলারের প্রশাসন। যেহেতু অস্ট্রিয়া বলে তখন গোটা বিশ্বে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, তাই সুইডেনকে আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশ্বকাপে।
১৯৩৮ বিশ্বকাপে জার্মান স্কোয়াড।
মাত্র ২ বছর আগে অলিম্পিকে রানার্স হওয়া অস্ট্রিয়া ছিল বিশ্বকাপ জেতার অন্যতম দাবিদার। 'উন্দারটিম' নামে ফুটবলমহলে পরিচিত ছিল অস্ট্রিয়া। সেই উন্দারটিমের ৯ সদস্যকে জোর করে নেওয়া হয় জার্মান স্কোয়াডে। মিলিজুলি দল নিয়ে বিশ্বকাপে নেমে পড়ল জার্মানি। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার যুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-৪ ফলে হার। এগিয়ে থেকেও হার, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় জার্মানি। তারপর স্বভাবতই অস্ট্রিয়ার ফুটবলারদের কাঠগড়ায় তোলে হিটলারের প্রশাসন।
ভয়ংকর সেই দুঃস্বপ্নের অধ্যায় অবশ্য পেরিয়ে এসেছে অস্ট্রিয়া। ১৯৫৫ সালে আবারও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে তারা ফিরে আসে মানচিত্রে। তবে কোমর ভেঙে যাওয়া ফুটবল আর পৌঁছতে পারেনি আগের উচ্চতায়। চলতি বিশ্বকাপে তারা খেলেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে স্পেনের কাছে হেরে শেষ হয় অস্ট্রিয়ার এবারের বিশ্বকাপ।
