আর্জেন্টিনা: ২ (এনজো, লাউতারো)
ইংল্যান্ড: ১ (গর্ডন)
খেলার জন্ম বিলেতে! বারবার-হাজারবার সেটা চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিল আর্জেন্টিনা। হারের আগে হারব না। চল, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। সঙ্গে লিওনেল মেসি আছেন। মাথার উপর দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা আছেন। আমরা বিশ্বসেরা। 'চিরশত্রু' ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য কামব্যাকে ফের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলে ম্যাচ জিতলেন লিওনেল মেসিরা। শুরুতে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংরেজরা। ৮৫ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। আর অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ জেতালেন লাউতারো মার্টিনেজ। দু'টো গোলেরই অ্যাসিস্ট একজনের- লিওনেল মেসি। না, এই ম্যাচে কোনও রেফারিং বিতর্ক ছিল না। ছিল রক্ত-ঘাম এক করে দিয়ে লড়াই। ইংল্যান্ড ঠিক এই খিদেটার কাছে হেরে গেল।
আটলান্টা স্টেডিয়ামে শুরুতে শুধুই মারামারি। এ কী চলছে? একে কি ফুটবল বলে? কিন্তু আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজের সীমাবদ্ধতা জানেন। একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক- ৭-১২। প্রথমার্ধ শেষে এটা ছিল পরিসংখ্যান। না, গোল লক্ষ্য করে শট নয়। এটা হল ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচে প্রথমার্ধে ফাউলের পরিসংখ্যান। ব্যাটল অফ আটলান্টা নয়, একে নয়া ফকল্যান্ড যুদ্ধ বললেও ভুল বলা হয় না। দু’টো দল নেমেছিল রণং দেহি মেজাজে। লিওনেল মেসি নামক এক ম্যাজিশিয়ান মাঠে থাকা সত্বেও প্রথমার্ধ জুড়ে শুধু কুস্তি চলল। গোল লক্ষ্য করে শট ইংল্যান্ডের মাত্র একটি। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মূলত একটা ট্যাকটিক্স নিয়েই নেমেছে। মেসি যা করবেন।
গোলের পর উচ্ছ্বাস মেসিদের। ছবি: পিটিআই
এদিন আরেকটা ট্যাকটিক্সও ছিল, ইংল্যান্ডকে খেলতে দিও না। যে কারণে রড্রিগো ডি’পলের জায়গায় কোচ লিওনেল স্কালোনি ডানদিকে নামালেন গিউলিয়ানো সিমিওনেকে। বাবা দিয়েগো সিমিওনের মতোই লড়াকু। বাকি কাজটা করলেন ডি’পলের মতোই- ধস্তাধস্তি। শুধু একটু দ্রুত গতিতে। তবে অন্য ম্যাচের তুলনায় আর্জেন্টিনা ডিফেন্সকে প্রথমার্ধে অনেক সংঘবদ্ধ দেখিয়েছে। মারামারি করেই হোক, বা যেভাবে জুড বেলিংহ্যামরা জায়গা পাননি। ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল কেন সাকা বা মাদুয়েকে থাকতে কেন মর্গান রজার্সকে প্রথম একাদশে রাখলেন, তা একটা প্রশ্ন। তবে একটা কাজ টুখেল বেশ যত্ন নিয়েই করার চেষ্টা করেছিলেন। ম্যাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে একজন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, লিওনেল মেসিকে আটকাতে জোনাল মার্কিং করবেন কি না। টুখেল একেবারে পুলিশম্যান মার্কিংয়ে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে মেসির পিছনে জুড়ে দিলেন। কমবয়সে এরকম চার-পাঁচটা এলিয়টকে মেসি জলপান করে নিতেন। এখন বয়স হয়েছে, মাঝেমধ্যে দাঁতে বিঁধে যায়। তাতেও দুয়েকবার অবিশ্বাস্যভাবে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। দু’দলের বলই মাঝমাঠের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল। বিস্তর ফাউল ও দু’টো হলুদ কার্ড। গোলের আশেপাশেও কেউ পৌঁছতে পারেননি।
ম্যাচের পর উচ্ছ্বসিত মেসিদের। ছবি: পিটিআই
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই স্বমহিমায় ফিরল আর্জেন্টিনার রক্ষণ। এরকম হাইভোল্টেজ ম্যাচে একটাও ভুল করতে নেই। সেটা বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। বাজে ক্লিয়ারেন্স, অফসাইড তৈরি করতে ভুল। মুহূর্তের মধ্যে বক্সে ক্রস তুলে দিলেন মর্গান। ইংরেজ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন জালে বল জড়িয়ে দিলেন। নাহুয়েল মোলিনা কভার পর্যন্ত করলেন না। ম্যাচের বয়স তখন ৫৫ মিনিট। এবার টুখেল পুরো ডিফেন্সে তালা লাগানোর চেষ্টা করলেন। বক্সের সামনে পায়ের জঙ্গল। কিন্তু সেটাকে ছিঁড়ে বেরনোর মতো স্কিলফুল কেউ নেই আর্জেন্টিনা দলে। নীল-সাদা ভক্তরা ‘ঈশ্বর’ আরাধনার মধ্যে এক ‘অ্যাঞ্জেল’-এর জন্য হাহুতাশ করছেন হয়তো।
গোলের পর এনজো ফার্নান্দেজ। ছবি: পিটিআই
কিন্তু না, টুখেল জানেন, গোটা দুনিয়া জানে। ৩৯ বছরের এক 'বুড়ো' আছেন। যিনি পায়ের সূক্ষ্ম ছোঁয়ায় বিপক্ষকে আজও মাটি ধরিয়ে দিতে পারেন। তিনি জাগলে ভয়ানক। কারও রোখার সাধ্যি নেই। ম্যাচের আগে জলাটান ইব্রাহিমোভিচ বলেছিলেন, এই ম্যাচে 'হ্যান্ড অফ গড' নয়, 'লেফট লেগ অফ গড' দেখা যাবে। পিছিয়ে পড়ার পর আর কোনও ফর্মেশন নয়। অলআউট আক্রমণ। ইংল্যান্ড বক্সে উড়ে এল একের পর এক ক্রস। সম্ভবত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন টুখেলও। নাহলে ক্রস ওড়ানো বন্ধ না করে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে লোক বাড়ালেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকলে হয়তো বলেই বসতেন, 'এভাবে নয়, এভাবে ঠিক হয় না।' অতএব যা হওয়ার তাই হল। পুরো চাপটা গিয়ে পড়ল ইংরেজ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের উপর।
গোলের পর এনজো। ছবি: পিটিআই
৬৮ মিনিটে নিকো গঞ্জালেজের হেড ঝাঁপিয়ে পড়ে সেভ করেন পিকফোর্ড। ৭৫ মিনিটে ফেরাল বার। ৮৪ মিনিটে এনজোর দূরপাল্লার শট। গোলের খুব কাছে, তবু দূরে। আর কতক্ষণ চাপ সামলাবে ইংল্যান্ড? আদৌ পারবে তো? ভাবার আগেই ধেয়ে এল এক বুলেট। বেরোল সেই এনজোর পা থেকে। গোটা আটলান্টা স্টেডিয়াম কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল গোটা দুনিয়া। আর্জেন্টিনা সমতা ফিরিয়েছে। খেলা এখনও বাকি! হাতে এখনও কিছুটা সময় আছে। ইতিমধ্যে স্কালোনি মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন লাউতারো মার্টিনেজকে। এখনও পর্যন্ত আর্জেন্টইনার বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। মেসিরা নাকি রেফারির সাহায্য পাচ্ছেন। এই ন্যারেটিভের চক্করে অনেকে ভুলেই গিয়েছিল, আগের ম্যাচগুলোতে নীল-সাদা জার্সিধারীরা কীভাবে ঝড় তুলে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডও বোধহয় ভুলে গিয়েছিল। আরেকটা জিনিসও সম্ভবত তাঁরা মনে রাখেনি। লিও মেসির শুধু বাঁ পা নয়, ডান পাও আছে। পরিসংখ্যান দিয়ে বলে দেওয়া যায়, কেরিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলগুলো ডান পা থেকেই এসেছে। এদিন এল অ্যাসিস্ট। যেন দৈব লিখন। লাউতারো ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ছিলেন। ডানদিক থেকে ভেসে আসা বল অবাধে জালে জড়িয়ে দিলেন। ২-১ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। এরপর আর ম্যাচে কিছু থাকে না। তে পারে না। যেটা থাকে, সেটা হল মেসি নামের এক আবেগ। গোল না হলে অ্যাসিস্ট। নিদেনপক্ষে গোটা মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো। ফাইনালে সামনে স্পেন। 'ঈশ্বর' মেসির সঙ্গে 'বরপুত্র' ইয়ামালের লড়াই। একদিকে স্পেনের মাপা ফুটবল, অন্যদিকে মেসি ও একদল দামাল ছেলে। ফাইনাল শো-ডাউন ১৯ জুলাই রাতে।
