আই অ্যাম ব্যাক...
উজবেকিস্তান ম্যাচ তখন শেষ। স্কোরলাইন সবার জানা। হ্যাটট্রিক অল্পের জন্য হাতছাড়া। তবে ৪১ বছরের বুড়োটার লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছে তামাম ফুটবলদুনিয়া। আর তিনি তখন কী করছেন? চেনা উগ্র মেজাজে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, গলার শিরা ফুলিয়ে, তর্জনী বুকে ঠেকিয়ে পর্তুগিজ ফুটবল দস্যু বললেন প্রতিবেদনের শুরুর লাইন।
আরও একবার শুনবেন? বলা ভাল পড়বেন রোনাল্ডো ভক্তরা?
আই অ্যাম ব্যাক...
সাধারণত, মাতৃভাষা পর্তুগিজে কথা বলতে পছন্দ করেন সিআর সেভেন। তবে, এই কথাগুলো বললেন স্পষ্ট ইংরেজিতেই। কারও মতে, যাতে তাঁর এই সতর্কবাণীর বাণে বিদ্ধ হতে পারেন দুনিয়া জুড়ে থাকা তাঁর শুভানুধ্যায়ী, থুরি, তাঁর সমালোচকরা।
গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে রোনাল্ডো। ছবি: পিটিআই
বিশ্বকাপ আসে। বিশ্বকাপ যায়। প্রতিবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা উপাসককে। গতবার কাতারে তাঁর চিরপ্রতীদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি যেদিন স্পর্শ করলেন সোনার পরীকে, তার পর থেকে যেন আরও তীব্রতা পেয়েছে সমালোচনা। তিনি চুপ থেকেছেন। তিনি বিদ্ধ হয়েছেন। তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন। তিনি নিজেকে আরও আরও বেশি করে ঘষেছেন, মেজেছেন, ত্যাগ করেছেন, তৈরি করেছেন। তিনি নিজেও জানেন, বিজ্ঞান বলে যে বস্তুটি আছে, তা বলছে ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলা তাঁর পক্ষে ইমপসিবল। তবে যেহেতু তিনি অতিমানব, তাই হয়তো এখান থেকেও তিনি বলতেই পারেন আই অ্যাম পসিবল। তবু কোনও ফাঁক রাখতে চান না ক্রিশ্চিয়ানো। হয়তো এখনও মুখে কিছু বলেননি। তবে খুব সম্ভবত রোজ মনে মনে নিজেকে বলছেন, “সিআর, গুরু হয় এবার নয় নেভার।” তাই তো এই বয়সেও টানা দু’টো ম্যাচ ৯০ মিনিট খেলে ফেললেন। উজার করে দিলেন নিজের সেরার সেরা। উজবেকদের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করার জন্য যে ছটফটানি দেখালেন, তা তাঁর অর্ধেক বয়সী অনেকের মধ্যেও দেখা যায় না। কে বলবে লোকটা আর মাত্র কয়েক কদম দূরে নিজের হাজারতম গোলের থেকে। তবু এই যে গোলের খিদে, এটাই যেন তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দেয়।
ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে পয়েন্ট ভাগ করে বিশ্ব অভিযান শুরু করার পর আরও একবার দাঁতে নখে শান দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তাঁর সমালোচকরা। আরও একবার যেন তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন গহন অন্ধকারে। কিন্তু তিনি থামেননি। ওই যে। হয় এবার, নয় নেভার...! সতীর্থদের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। কথা বলেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘বসিং’ করার যে অভিযোগ, তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন আটলান্টিক মহাসাগরে। তার প্রতিফলন যেন মিলল উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, জোয়াও ফেলিক্স, পেদ্রো নেটোরা বল বাড়ালেন সিআরকে। তিনিও ‘নাটক’ করে ফ্রিকিক মারার সুযোগ করে দিলেন নুনো মেন্ডেজকে। সারাক্ষণ যেন কিছু না বলেও বলে গেলেন, “কারা যেন আমায় স্বার্থপর বলে? কারা যেন বলে আমি টিম ম্যান নই? এই দেখুন আমার টিম। এই দেখুন টিম গেম।”
রোনাল্ডোর দ্বিতীয় গোলের মুহূর্ত। ছবি: পিটিআই
ম্যাচের পর হঠাৎ কেন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে অমন গর্জন করলেন তিনি? সাংবাদিকদের জবাবে বললেন, “যাঁরা আমার দিকে আঙুল তুলছিলেন, তাঁদের বোঝানোর জন্য যে, আমি কে, আমি কী, সেটা যেন ওঁরা না ভোলেন।” সঙ্গে জুড়লেন, “গত এক সপ্তাহ আমাদের কাছে খুব কঠিন ছিল। আমরা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিলাম। সবাই মিলে কথা বলেছিলাম। ঠিক করেছিলাম প্রত্যাবর্তনের লড়াই লড়ব। আর জানেন তো, ঈশ্বর তাঁদের সঙ্গেই থাকেন, যাঁরা হাল ছেড়ে না দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে। সৎ থাকে। সবাইকে বলেছিলাম, আমরা পারব। পারতেই হবে। আমার টিমের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। সেটা যে ভুল নয়, প্রমাণ হল।”
এতদিন নিজেকে দলের ঊর্ধ্বে রাখা সিআর কতখানি নিজেকে বদল করেছেন, তার আরও একটি উদাহরণ মিলল ম্যাচ শেষের পর। নিজের সামাজিকমাধ্যমে দু’টি ছবি শেয়ার করলেন তিনি। যার প্রথমটিতে অবশ্যই তাঁর বিখ্যাত ‘সিউ’ সেলিব্রেশন। অন্যটিতে সতীর্থদের বুকে টেনে নিচ্ছেন তিনি। পর্তুগিজ ভাষায় ক্যাপশনে লিখলেন, ‘এস্তামোস আকুই।’ বাংলায় তর্জমা করলে যার মানে দাঁড়ায়, এই যে আমরা।
সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করার একটা ধাপ পার করলেন সিআর। বাকি এখনও ছ’টা ম্যাচ। রোনাল্ডো কি পারবেন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দু’হাতে সোনার পরী মাথার উপরে তুলে হাসি মুখে মাঠ ছাড়তে? সেই উত্তর দেবে সময়। তবে আপাতত যেন তিনি তাঁর সমালোচকদের এক কড়া বার্তা দিয়ে গেলেন।
অভি হাম জিন্দা হ্যায়।
