আচ্ছা বলুন তো, রবিবার জার্মানি কি নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে খেলতে নামছে? এই টুকু পড়ে আপনি হয়তো ভাবছেন, জার্মানির বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) অভিযানের মুখে হয়তো আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। না হলে প্রতিপক্ষ কুরাসাওয়ের নাম (Germany vs Curacao Preview)। না বলে, নেদারল্যান্ডস বলছি কেন?
তাহলে আপনাকে বলি জার্মানির প্রথম সারির সংবাদপত্র 'বিল্ড' এর হেডলাইনটা পড়ে ফেলুন। যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়- "নেদারল্যান্ডস যখন কুরাসাও সেজে আসে।" হিউস্টনে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযান। কুরাসাও নামটা শুনে যারা ভাবছেন, জার্মানি স্রেফ নামবে আর জিতবে, তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন।
আর হেঁয়ালির দরকার নেই। ব্যাপারটা খুলে বলা যাক। কুরাসাওয়ের ২৬ জনের স্কোয়াডের দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনই জন্মেছেন নেদারল্যান্ডসে! ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের প্রাক্তন তারকা তাহিথ চং থেকে শুরু করে বাকি সব ফুটবলার উঠে এসেছেন ডাচ ফুটবলের টোটাল অ্যাকাডেমি কালচার থেকে। এখানেই শেষ নয়। রবিবার জার্মানির বিরুদ্ধে কুরাসাওয়ের ডাগআউটে বসবেন ডিক অ্যাডভোকাটের মতো পোড়খাওয়া ডাচ চাণক্য। বিশ্বকাপ ড্র-এর আগে জার্মানির অর্ধেক ফুটবলার জানতেনই না, কুরাসাওয়া বলে কোনও দেশ ফুটবল খেলে। কিন্তু জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান জানেন, কুরাসাও আসলে ছদ্মবেশী এক নেদারল্যান্ডস দল। এই 'ক্যারিবীয় টোটাল ফুটবল' যদি শুরুতে ধাক্কা দেয়, তবে জার্মানির বিশ্বকাপ স্বপ্ন হিউস্টনের মাঠেই বড় ধাক্কা খাবে।
আমেরিকার বিশ্বকাপ জার্মানির সামনে শুধুই জেতার লড়াই নয়। নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সম্মান পুনরুদ্ধারের এক যুদ্ধক্ষেত্র। জার্মানি এবং বিশ্বকাপ। এই দুইয়ের মাঝে 'ব্যর্থতা' শব্দটা বড়ই বেমানান। কিন্তু গত দুটো বিশ্বকাপের ইতিহাস জার্মান ফুটবলের ঐতিহ্য-অহংকার সব ভেঙে চুরে একশেষ করে দিয়েছে। ২০১৮, রাশিয়া বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে মাঠে নেমে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়! সেই লজ্জা, ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপেও একইভাবে বহমান। ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি! টানা দু-দুটি বিশ্বকাপে নকআউটের মুখ না দেখে গ্রুপ স্টেজ থেকে বিদায় নেওয়াটা চারবার বিশ্বকাপ জেতা জার্মানির অহংকারে এক বিরাট চাবুক। স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার মাটিতে পা দেওয়া ইস্তক, জার্মানির সেই পুরনো ব্যর্থতার কঙ্কালগুলো নাড়াচাড়া করতে শুরু করে দিয়েছে।
নাগেলসম্যানের দলের ওপর এবার তাই অদৃশ্য এক পাহাড়প্রমাণ চাপ। প্রথম লক্ষ্য, টানা তিনবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার কলঙ্ক আটকানো। তারপর বিশ্বকাপের গরিমা পুনরুদ্ধার।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো হলিউডি ক্ল্যাসিক সিনেমার সেট। আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনার উইনস্টন সালেমের ঐতিহাসিক 'দ্য গ্রেলাইন এস্টেট'। রাজকীয় স্থাপত্য, চোখজুড়ানো লন, আর নিঝুম নীরবতা। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি তাদের পঞ্চম নক্ষত্র শিকারের জন্য বেছে নিয়েছে এই প্রাচীন দুর্গটিকে। আর এই রাজকীয় নিস্তব্ধতার অন্দরেই লুকিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। চারিদিকে শুধুই ইতিহাস আর গাছপালা। নিজেদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের পিছনে এরকম একটা পরিবেশে বেসক্যাম্প করার পিছনে নাগেলসম্যানের একটাই উদ্দেশ্য থাকতে পারে। মার্কিন মুলুকের কোলাহল থেকে দূরে, উইনস্টন সালেমের এই নির্জনতাই আসলে দলকে এক সুতোয় বাঁধার সেরা পন্থা। যেখানে বাইরের দুনিয়ার কোনো চাপ নেই, আছে শুধু নিজেদের ফুটবলারদের নিজস্ব এক পৃথিবী।
২০১৮, রাশিয়া বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে মাঠে নেমে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়! সেই লজ্জা, ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপেও একইভাবে বহমান। ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি! টানা দু-দুটি বিশ্বকাপে নকআউটের মুখ না দেখে গ্রুপ স্টেজ থেকে বিদায় নেওয়াটা চারবার বিশ্বকাপ জেতা জার্মানির অহংকারে এক বিরাট চাবুক।
তবে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তেই জার্মান শিবিরে নেমে এসেছে এক চরম দুঃসংবাদ। ১৮ বছরের বিস্ময়, লেনার্ট কার্ল। ফ্লোরিয়ান উইজ বা জামাল মুসিয়ালার মতোই যাকে ভাবা হচ্ছিল জার্মান মিডফিল্ডে আগামীর জেনারেল। কিন্তু অনুশীলনে পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ব্যস! সব স্বপ্ন চুরমার। চোখের জলে বিদায় নিলেন বিশ্বকাপ থেকে। কঠিন মানসিকতার জার্মানরা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও, বিশ্বকাপের ঠিক আগে এই চোট পুরো জার্মানি শিবিরকে মানসিকভাবে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে। টনি ক্রুসের বিদায়ের পর মাঝমাঠে যেখানে একটা বড় শূন্যতা, সেখানে লেনার্টের এই ছিটকে যাওয়া নাগেলসম্যানের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করে দিয়েছে।
কিন্তু দলটার নাম তো জার্মানি। কখন যে ঘুরে দাঁড়িয়ে আপনাকে বোকা বানিয়ে দেবে, বুঝতেই পারবেন না। কার্লের চোটের হতাশা ভুলে দল এখন তাকিয়ে ৪০ বছর বয়সি বুড়ো হাড়ের ভেল্কির দিকে। ম্যানুয়েল ন্যুয়ার। অলিভার বাউম্যানকে বসিয়ে ন্যয়ারকে যখন এক নম্বর গোলরক্ষক করা হল, জার্মান সংবাদমাধ্যমে সে কী জবরদস্ত সমালোচনা। কিন্তু নাগেলসম্যানের একটাই জবাব ছিল, বক্সের মধ্যে ন্যয়ারের উপস্থিতি, বিপক্ষ স্ট্রাইকারকে বক্সে ঢোকার আগেই কাঁপিয়ে দেয়। লিয়ন গোরেৎজকা আর জামাল মুসিয়ালাকে নিয়ে গড়া বায়ার্ন মিউনিখের মিডফিল্ড হচ্ছে এবারের জার্মানদের মূল মেরুদণ্ড। তার উপর টানা ৯ ম্যাচ জিতে ফর্মে থাকার বিষয়টিকেও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
দলটার নাম তো জার্মানি। কখন যে ঘুরে দাঁড়িয়ে আপনাকে বোকা বানিয়ে দেবে, বুঝতেই পারবেন না। কার্লের চোটের হতাশা ভুলে দল এখন তাকিয়ে ৪০ বছর বয়সি বুড়ো হাড়ের ভেল্কির দিকে। ম্যানুয়েল ন্যুয়ার। অলিভার বাউম্যানকে বসিয়ে ন্যয়ারকে যখন এক নম্বর গোলরক্ষক করা হল, জার্মান সংবাদমাধ্যমে সে কী জবরদস্ত সমালোচনা।
এবার বিশ্বকাপে হেভিওয়েট জার্মানির বিরুদ্ধে অভিষেক হতে চলেছে ৪৪৪ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট দেশ কুরাসাওয়ের। আয়তনের দিক থেকে দেশটি জার্মানির বার্লিনে শহরের আয়তনেরও অর্ধেক। জনসংখ্যা দেড় লক্ষের একটু বেশি। সেই কুরাসাওয়ের জন্য রবিবার এক ঐতিহাসিক দিন। চার বারের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানির বিরুদ্ধে নামার আগে কুরাসাও দলের অভিজ্ঞ গোলকিপার এলোয় রুম স্বাভাবিকভাবেই কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, জার্মানিকে আদতে নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় দলের বিরুদ্ধে খেলতে হবে রবিবার। ৩৭ বছর বয়সি রুম বলেন, "জার্মানি দলের কাছে এই ম্যাচটা অনেকটা নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় দলের বিরুদ্ধে খেলার মতো। কারণ আমাদের অধিকাংশ ফুটবলারেরই জন্ম নেদারল্যান্ডসে। সেই জন্যই জার্মানির বিরুদ্ধে খেলতে নামলে আমরা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হব।” এই ম্যাচে নামার আগে রুমরা বিভিন্নভাবে জার্মানিকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, জার্মানরা রবিবার খেলতে নামবে 'ছদ্মবেশী' নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে।
শুধু রুমই বলেননি। তাঁর কথাকে সমর্থন করছেন তাঁর সতীর্থ ডিফেন্ডার রোশন ভ্যান এজমাও। তিনি আবার ম্যাচের ফলাফলেরও ভবিষ্যদ্বাণী করে দিয়েছেন। বলেছেন, এই ম্যাচে নাকি কুরাসাও জিতবে ২-০ গোলে। কুরাসাওয়ের আর এক ডিফেন্ডার জুরেন গ্যারি বলেন, "জার্মানির বিরুদ্ধে মাঠে সিংহের মতো বিচরণ করব আমরা। মানসিকভাবে সেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।"
