ফিলাডেলফিয়াতে ‘মিউজিয়াম অব আর্ট’-এ মূর্তিটি দেখেছিলাম। ‘রকি বালবোয়া’র মূর্তি। কিন্তু সেই মূর্তি ঘিরে যে প্রযুক্তিগত উচ্চতায় আধুনিক একটি দেশেও এরকম কুসংস্কার ঘিরে থাকতে পারে, তখন বুঝিনি। আর সেই কুসংস্কারের ধাক্কায় বিশ্বকাপের বাজারেও যে এরকম হুলুস্থুলু কাণ্ড ঘটে যাবে, না জানলে বিশ্বাসই করা যেত না।
৮২’-তে রকি-৩ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য হলিউড অভিনেতা সিলভেস্টার স্ট্যালন ‘রকি-র একটা ব্রোঞ্জের মূর্তিটি তৈরি করিয়েছিলেন। শুট শেষ হলে মূর্তিটি ফিলাডেলফিয়ার এই ‘মিউজিয়াম অব আর্ট’এ উপহার দিয়ে দেন তিনি। শুরুর দিকে এটি ছিল মিউজিয়ামের সিঁড়ির নিচের দিকে। কিন্তু মূর্তির সামনে দু’হাত প্রসারিত করে রকির ভঙ্গিতে ছবি তোলার জন্য এমন হুড়োহুড়ি পড়ে যায় যে, মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ রকির মূর্তিটিকে এখন সিঁড়ির উপরে নিয়ে এসেছে। আর সেই মূর্তি ঘিরেই আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে যত মূর্তিমানদের দাপাদাপি।
ফিলাডেলিফায় এই মূর্তি ঘিরে অদ্ভুত একটা কুসংস্কার রয়েছে। এটি আরও বেশি দেখা যায়, শহরে বাস্কেটবল অথবা বেসবলের ম্যাচ থাকলে। ম্যাচের আগে যে দলের জার্সি স্কার্ফ, পতাকা বা অন্য যা কিছু যদি এই মূর্তির সামনে সাজিয়ে রাখা যায়, তাহলে সেই দল হারবেই হারবে। ফিলাডেলফিয়ার লোকজন এরকম করে নাকি বহুবার শহরের বেসবল অথবা আমেরিকান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। খবরটা জানতে পেরেই নাকি ফিলাডেলফিয়াতে থাকা থাকা কিছু কেপ ভার্দের সমর্থক চুপি চুপি গিয়েছিলেন, রকি বালবোয়ার মূর্তির সামনে আর্জেন্টিনার জার্সি আর স্কার্ফ সাজিয়ে রাখতে। ব্যাস, তা নিয়েই হুলুস্থুলু কাণ্ড। সেই সময় মিউজিয়াম পরিদর্শনে ছিলেন বেশ কিছু আর্জেন্টাইন সমর্থকও। হাতে নাতে ধরে ফেলে কেপ ভার্দের সমর্থকদের। সেখান থেকে মারপিট।
রকি বালবোয়ার মূর্তি। ছবি: সংগৃহীত।
আপনি হয়তো ভাবছেন, রাউন্ড অফ ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কী আর লড়াই দেবে কেপ ভার্দে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, লড়াইটা কিন্তু ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে মাঠের বাইরে। অনেকেই ম্যাচটিকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’-এর রূপক অর্থে ব্যবহার করছেন। কিন্তু ভুললে চলবে না, ছোট্ট ডেভিড কীভাবে পাথর ছুড়ে হত্যা করেছিল বিশালাকায় গোলিয়াথকে। ফলে নকআউট পর্যায়ে এসে কেপ ভার্দেকে নিয়ে সামান্যতম ঝুঁকিও নিতে চাইছে না আর্জেন্টিনা। পচা শামুকে পা কাটার উদাহরণ তো বিশ্বফুটবলে ঝুড়ি ঝুড়ি।
টানা ৩৬টি ম্যাচ জিতে গত বিশ্বকাপেই কাতারে শুরুর ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে যাওয়ার ঘটনা আর্জেন্টিনা ভুলে গিয়েছে? কিংবা ২০০২-এ জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে, জিদান, অঁরিদের মতো তারকা সমৃদ্ধ ফ্রান্স কীভাবে দুর্বল সেনেগালের কাছে হেরে গিয়েছিল? ’৯০ বিশ্বকাপেও তো লাল কার্ডের জন্য ৯ জনে খেলা দুর্বল ক্যামেরুন হারিয়ে দিয়েছিল মারাদোনার আর্জেন্টিনাকে। ফলে কেপ ভার্দে ম্যাচের আগে স্কালোনির ড্রেসিংরুমে ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ নামক শব্দটির ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’ বলে বড় করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়ে গিয়েছে। তবে স্কালোনির ব্যক্তিগত স্তরে আত্মবিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়েছে জর্ডন ম্যাচে রিজার্ভ বেঞ্চের শক্তি দেখার পর। বিশেষ করে লউটারো মার্টিনেজের গোলের পর। পরিশ্রম করছেন। শেপ বজায় রেখে খেলছেন। কিন্তু কিছুতেই গোল পাচ্ছিলেন না আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার। তাই স্কালোনিও বুঝে উঠতে পারছিলেন না, প্রথম দলে মেসির সঙ্গে কাকে রাখা উচিত, লউটারো না কি জুলিয়ান আলভারেজ? বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত প্রথম দলে আলভারেজের জায়গাই নিশ্চিত ছিল। কিন্তু প্রস্তুতি ম্যাচে গোড়ালির চোটটাই কিছুটা পিছিয়ে দেয় তাঁকে। তবে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে আরও যে ক’টি প্র্যাকটিসের সুযোগ পাওয়া যাবে, সেখানেই স্কালোনি নিশ্চিত করবেন তাঁর ফরোয়ার্ড লাইন।
মেসি। ফাইল ছবি।
কিন্তু ডিফেন্ডার রোমেরোর চোট নিয়ে সত্যিই চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন আর্জেন্টাইন কোচ। টটেনহ্যামের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে খেলার সময় ডান হাঁটুর ঠিক যেখানে চোট পেয়েছিলেন, অস্ট্রিয়া ম্যাচেও চোটটা লেগেছে ঠিক সেখানে। ফলে অস্বস্তি তো একটা আছেই। রোমোরোর চোট সেরে ওঠা নিয়ে স্কালোনি ভীষণভাবেই আশাবাদী হলেও, এখনও কিন্তু দলের সঙ্গে প্র্যাকটিসে নামতে পারেননি আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। ফলে আর্জেন্টিনা টিম ম্যানেজমেন্ট এখনও জানে না, কেপভার্দের বিরুদ্ধে রোমেরোকে খেলানো সম্ভব হবে কি না। তবে পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, স্কালোনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, একশো শতাংশ ফিট না হলে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে খেলানো হবে না রোমেরোকে। সেক্ষেত্রে ভাবা হচ্ছে ফের নিকোলাস ওটামেন্ডির কথা। একটাই যা ভাল দিক। ম্যাচের আগে এখনও হাতে চারটে দিন সময় আছে। আর অবশ্যই দলে ‘মেসি’ নামক একজন মহামানব আছেন।
