সাফল্য কীভাবে সব কিছু বদলে দেয়। তাই চ্যাম্পিয়নরা বলেন, যে কোনও মন খারাপের একটাই ওষুধ, সাফল্য-সাফল্য আর সাফল্য। এই যেমন দেখুন না, বিশ্বকাপের সিআর-এর প্রথম ম্যাচ। কঙ্গোর বিরুদ্ধে গোল না পাওয়াতে বিশ্বজুড়ে সমালোচনায় ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছিল সিআর সেভেনকে। এই ৪১-এর বুড়োর পক্ষে আর কিছুই সম্ভব নয়। তার উপর ড্রেসিংরুমে অন্যান্য ফুটবলারদের থেকে রোনাল্ডো কতটা একা। কেউ না কি, তার এই ঔদ্ধত্য পছন্দ করেন না। ফলে অধিনায়ক হওয়ার পরেও না কি, সহ ফুটবলারদের কাছে অধিনায়কের প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছিলেন না। এরকম হাজারো, হাজারো অভিযোগ রটছিল। নিজের ২ গোল। আর দলের পাঁচ গোল। ব্যাস, রোনাল্ডোকে ঘিরে পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ইউ টার্ন খোদ পর্তুগালের সংবাদ মাধ্যমগুলিতেই। বলা হচ্ছে, রোনাল্ডোর মতো এরকম নেতা হয় না। মাঠে, মাঠের বাইরে ড্রেসিংরুমে জুনিয়র ফুটবলারদের কাছে আদর্শ তিনি।
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলার জন্য শুক্রবার দুপুরেই মায়ামিতে পা দিতে চলেছে রোনাল্ডো-সহ পুরো পর্তুগাল টিম। ব্রাজিল-পর্তুগাল-আর্জেন্টিনা। বিশ্বফুটবলের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের পদার্পণকে ঘিরে বদলে গিয়েছে মায়ামির পরিবেশ। তার উপর মায়ামি হচ্ছে মেসির ঘরের মাঠ। কিন্তু তথ্য বলছে, শুধুমাত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর জনই মায়ামিতে পর্তুগাল দলকে নিয়ে মারাত্মক পর্যায়ের নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে ২ গোল করে ফের গোলের মঞ্চে ফিরে আসায়, রোনাল্ডো আবার স্বমহিমায়। সবাই এখন মুহূর্তের জন্য হলেও রোনাল্ডোকে একবার দেখতে চাইছেন। ছুঁতে চাইছেন। তাই মায়ামিতে উপস্থিত ফিফা কর্তারা বলছিলেন, রোনাল্ডোর জন্য নতুন করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয়েছে। মেসির ঘরের মাঠেই সিআর সেভেন-কে নিয়ে মারাত্মক পর্যায়ের উত্তেজনা। ফলে ম্যাচের টিকিটের দামও মারাত্মক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কঙ্গো ম্যাচ শেষে মাঠেই সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলের সামনে চিৎকার করে বলেছিলেন, 'খারাপ খেললেই, বুড়ো হয়ে গিয়েছি। শেষ হয়ে গিয়েছি। সব কিছুর জবাব মাঠেই দিয়েছি।'
শুধু এই একটি বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, কঙ্গো ম্যাচের পর কী পরিমাণ চাপে ছিলেন তিনি। যেভাবে সংবাদমাধ্যম তাঁকে ক্ষত বিক্ষত করেছে, মেনে নিতে পারছিলেন না। এদিন, ফ্লোরিডায় বেস ক্যাম্পে জিমে হাল্কা স্ট্রেচিং আর আইস বাথ নিয়েছেন। দেখা যায়, দলের জুনিয়র ফুটবলারদের সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিতে। পরে কলম্বিয়া ম্যাচের পরিকল্পনা করার জন্য কোচ মার্টিনেজ যখন মিটিং ডাকেন, সেখানে কোচের পাশাপাশি রোনাল্ডো নিজেও নাকি অনেকক্ষণ বক্তব্য রেখেছেন। বারবার করে দলের জুনিয়র ফুটবলারদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এসব দেখেই অবাক হয়ে গিয়েছেন, মায়ামিতে ব্রাজিল ম্যাচ কভার করতে আসা নুনো। বলছিলেন, "এতদিন রোনাল্ডোকে আমরা সুপারস্টার হিসেবে দেখতাম। কিন্তু এই বিশ্বকাপে সত্যিই ওকে বদলে যেতে দেখছি। মনে হচ্ছে, নেতা নন। বন্ধু। মাঠের বাইরে জুনিয়র ফুটবলারদের বোঝাচ্ছে। উদ্বুদ্ধ করছে। এরকমটা শেষ দেখা গিয়েছিল, ইউরো জয়ের সময়। এমনকী মাঠের ভিতরে সাইড লাইনে এসেও অনেক সময় কোচের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা করছেন। আমরা তো এই রোনাল্ডোকেই চাইছিলাম।"
সত্যিই সাফল্য কীভাবে সামনের মানুষদের আচরণ বদলে দিতে পারে। কোচ মার্টিনেজ অবশ্য প্রথম দিন থেকেই রোনাল্ডোর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কঙ্গো ম্যাচে খারাপ পারফরম্যান্সের পর যখন দেশের সংবাদমাধ্যমগুলি আওয়াজ তুলেছিল, কাতার বিশ্বকাপের মতোই মার্টিনেজের উচিত, রোনাল্ডোকে বসিয়ে প্রথম একাদশ ঠিক করা। তখনও মার্টিনেজ ছিলেন সিআর সেভেনের পাশে। পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, পরের ম্যাচেও তাঁর প্রথম একাদশে থাকবেন। ফলও পেয়েছেন। সকলকে বোকা প্রমাণ করে এখন পর্তুগাল কোচ বলছেন, "ক্রিশ্চিয়ানো দলের একজন সম্পদ। যার ম্যাচ নিয়ে বিশ্লেষণের ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান, যে কোনও প্রতিষ্ঠিত কোচের মতোই।"
কীভাবে এতটা বদলে গেলেন রোনাল্ডো? পর্তুগিজ সাংবাদিকরা বলছেন, "হয়তো রোনাল্ডো বুঝতে পেরেছেন, বিশ্বকাপ জেতার এটাই শেষ সুযোগ। এখানে তাঁর নিজস্ব গোলের সংখ্যা বাড়ানোর থেকেও দলের জয়টা বেশি জরুরি। তাই হয়তো নিজেকে বদলে ফেলে বন্ধুর মতো মিশে গিয়েছেন ড্রেসিংরুমের সকলের সঙ্গে।" ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটা ড্রেসিংরুমের শক্তি বোঝা যায়, যখন কোনও একটা দল খারাপ সময়ের ভিতর থেকে যায়। সাকসেসে সব কিছুই মধুচন্দ্রিমার মতো মনে হয়।
