দীর্ঘ ৫২ বছরের অপেক্ষার পর আবার ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে ফিরে এসেছে হাইতি। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপের মূলপর্বে। এবার আলোচনায় তাদের জার্সিও। কারণ সেখানে জায়গা পেয়েছে পোল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। যা দেখে ফুটবলপ্রেমীরা কৌতূহলী। তাঁরা শুরু করেছেন এই গল্পের আসল খোঁজ। কেন হিস্পানিওলা দ্বীপের এই দেশের জার্সিতে ইউরোপের একটি দেশের প্রতীক?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দুই শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাসের ধুলোজমা কাহিনিতে। ১৮০২ সালের সেই উত্তাল সময়। সেই সময় হাইতি ছিল ফরাসি উপনিবেশ। দেশটির আকাশে তখন স্বাধীনতার অগ্নিশিখা। দিকে দিকে ক্রীতদাসদের বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহ দমাতে তৎকালীন ফরাসি শাসক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের নির্দেশে পাঠানো হয় প্রায় ৫,০০০ সৈন্য। যাদের বড় একটি অংশ ছিলেন তৎকালীন বিভক্ত ও পরাধীন পোল্যান্ড থেকে আসা। নিজের দেশও যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে ছটফট করছে, তখন তারা ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধ করতে এলেও অনেকেই মনে মনে বয়ে বেড়াচ্ছিল এক আশা। যদি ফ্রান্সকে সহায়তা করা যায়, তবে ভবিষ্যতে পোল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশে দাঁড়াবে তারা।
কিন্তু হাইতির মাটিতে পা রাখার পর সেই সব সেনার অনেকের চোখেই ধীরে ধীরে নেমে আসে এক কঠিন সত্যের পর্দা। বুঝতে পারেন, এই যুদ্ধ আসলে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা নিপীড়িত ক্রীতদাসদের বিরুদ্ধে। নিজের বিবেক আর পরাধীন মাতৃভূমির যন্ত্রণা একসঙ্গে মিলে অনেক পোলিশ সেনার মনকে নাড়িয়ে দেয়। আর সেই দ্বিধার ভিতরেই অনুতাপের জন্ম। এই অনুভূতি থেকে পোলিশ সেনারাই ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেন। যোগ দেন বিদ্রোহীদের দলে। রক্তমাখা আত্মত্যাগে গড়া সেই সংগ্রামে হাইতির স্বাধীনতার ইতিহাস এখনও ইট-কাঠ-পাথরের পাঁজরে ফিসফিস কথা বলে। ১৮০৪ সালে হাইতি স্বাধীনতা অর্জন করে। তখন দেশের নেতা জ্যাক দেসালিন পোলিশ সেনাদের অবদানকে বিশেষ মর্যাদা দিতে ভোলেননি।
হাইতির স্বাধীনতা সংগ্রামে পোলিশ সেনাদের অবদানের কীভাবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল? সময় গড়িয়ে তখন ১৯০৫ সাল। নতুন সংবিধান প্রণয়ন হয় হাইতিতে। শাসনতন্ত্র অনুযায়ী, দেশটিতে শ্বেতাঙ্গদের জমি কেনা নিষিদ্ধ থাকলেও পোলিশদের ক্ষেত্রে ছিল আলাদা ছাড়। সে সময় হাইতিতে থাকা প্রায় ৫০০ পোলিশ সেনা এই বিশেষ অনুমতির সুযোগে জমি কিনে ধীরে ধীরে সেখানেই থিতু হন। গড়ে তোলেন নতুন জীবন। মিশে যান স্থানীয় সমাজের রক্তধারায়। সময়ের প্রবাহে সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে, তা আজও দুই জাতির ইতিহাসে এক অটুট সেতুবন্ধনের কাজ করে। দুই দেশের এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের স্মারক হিসাবেই বিশ্বকাপের মঞ্চে হাইতির জার্সিতে জায়গা করে নিয়েছে পোল্যান্ডের পতাকা। এই আত্মত্যাগ আর কৃতজ্ঞতার ইতিহাসই আজও দুই দেশের সম্পর্ককে এক অদৃশ্য সুতোর মতো বেঁধে রেখেছে।
