লিওনেল মেসি-ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কান্না এখনও আবছা হয়ে যায়নি। কাপ ফাইনাল শেষে লামিন ইয়ামালের পুঁচকে ভাইয়ের ছেঁড়া জাল নিয়ে দুদ্দাড় দৌড়ের ছবি আজও টাটকা। আর্লিং হালান্ডের ‘ট্যাক্সিডার্মি রেকুন’ নিয়ে নরওয়ে ফেরার দৃশ্যও বাঙালি ভুলে যেতে পেরেছে কি? লিখে দিতে পারি, পারেনি। ফুটবল বিশ্বকাপকে কি কখনও আর দিন পাঁচেকে ভোলা যায়? বাকিদের কথা জানি না। অন্তত বাঙালি তা পারে না। ফুটবলপ্রেম তার জন্মগত যে!
অথচ করার নেই কিছু। ফুটবলের মহাযজ্ঞ আসে চার বছর পরপর। আর ফি বছর, নিত্য যে বস্তুখানি বঙ্গজীবনে ফিরে-ফিরে আসে, তার নাম ডার্বি (Kolkata Derby)। ফুটবল বিশ্বকাপ ‘খুশবুদার’ বিরিয়ানি হলে, ডার্বি বাঙালির পোলাও-কালিয়া। শনিবার যেমন আসছে। ঘটি-বাঙালের সনাতনী ফুটবল-যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে। যা বাঙালির একান্ত আপন। নিজস্ব। শুধু বঙ্গ ফুটবলের সে ‘পোলাও-কালিয়া’ থেকে পরিচিত স্বর্গীয় সুবাসটাই যা বেরোচ্ছে না! বেরোবে বা কী করে? দুই প্রধানের বিদেশিরা এখনও সেভাবে এসে পৌঁছননি যে। কতিপয় যে ক’জন এসেছেন, তাঁরা আদৌ নামবেন কি না (নামলেও পরিবর্ত) শতভাগ নিশ্চিত করা বলা যাচ্ছে না। কোথাও গিয়ে মনে হচ্ছে, মরশুমের প্রথম ডার্বিতে যত আকর্ষণ দুই প্রধানের কোচকে ঘিরে। তাঁরাই দৃশ্যত সবচেয়ে বড় সুপারস্টার!
সবুজ-মেরুনের প্র্যাকটিস (বাঁদিকে)। ছবি অপ্রতিম পাল। ডার্বির আগের দিন ইস্টবেঙ্গল শিবির (ডানদিকে)। ছবি অমিত মৌলিক।
মোহনবাগান (Mohun Bagan) কোচ প্যানাজিওটিস দিলেমপেরিস। এবং ইস্টবেঙ্গল (East Bengal) কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। ডুরান্ড কাপ শুরুই হচ্ছে শনিবাসরীয় ডার্বি দিয়ে। যার ফলে, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল, দু’দলই প্রস্তুতি-নিরিখে দুর্ধর্ষ জায়গায় রয়েছে, বলা যাবে না। প্রি-সিজনের কিছুই হয়নি সেভাবে। দু’দলের বিদেশি কোচরাই এসে পৌঁছেছেন দিন সাতেক হল। তবু খেলাটা দিন শেষে ডার্বি। স্ফুলিঙ্গ তাতে ধরতে কতক্ষণ? প্রাক্তনরা তো প্রায়শই বলে থাকেন, ডার্বি কারা খেলল, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কতজন তারকা খেলতে নামল, সেটাও ইম্পর্ট্যান্ট নয়।
ডার্বি এমনই এক মহামঞ্চ যা যে কোনও দিন, যে কোনও প্লেয়ারকে মহাতারকা করে দিতে পারে! ডার্বি আজও তারকার জন্ম দেয়! যাক গে। আপাতত শনিবারের ডার্বিতে মহাতারকা তাঁরাই, যাঁদের কথা আগে লিখলাম। দুই প্রধানের ‘হেডস্যর’। যাঁদের ঘিরে স্বপ্ন দেখছেন দুই প্রধানের সমর্থকরা। কলকাতা ডার্বিতে অপরাজিত হাবাস চাইবেন তাঁর রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখতে। বাগান কোচের কাছে আবার এই ডার্বি, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মঞ্চ। দিলেমপেরিস মানতে চাইলেন না, শনিবারের মহাযুদ্ধ দুই দলের দুই কোচের মগজাস্ত্রের ম্যাচ। বললেন, “ফুটবল এগারো বনাম এগারোর খেলা হয়। ফুটবলারদের উপরই ভরসা আছে আমার।” তবে স্বীকার করে নিলেন যে, ডার্বির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারেননি। সময়াভাবে। বললেন, ‘‘দু-তিন দিনের প্রস্তুতিতে ডার্বি খেলা কঠিন। তবে আমরা দ্রুত পুরো বিষয়টির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি।” মোহনবাগান কোচ স্বস্তি পাচ্ছেন একটা বিষয় ভেবে। তা হল, টিমে কোনও চোট-আঘাত নেই।
তবে শনিবাসরীয় ডার্বির একটা মাহাত্ম্য থাকবে। দু’দলে সেভাবে বিদেশিরা না থাকায় খেলার ‘রিমোট কন্ট্রোল’ দুই দলের ভারতীয় প্লেয়ারদের হাতে থাকারই বেশি সম্ভাবনা। ইস্টবেঙ্গলে আপাতত দু’জন বিদেশি প্লেয়ার এসেছেন। মহম্মদ রশিদ এবং দানি রামিরেজ। মোহনবাগানেও দুই। দেজান দ্রাজিচ এবং আলবার্তো রডরিগেজ। দ্বিতীয়জন, অর্থাৎ রডরিগেজ, এসে পৌঁছলেন শুক্রবার সন্ধেয়। দুই দলের চার বিদেশি যে শনিবার প্রথম একাদশে থাকবেন– কোনও গ্যারান্টি নেই। আর ঠিক সে কারণেই দুই দলের ভারতীয় প্লেয়াররা খেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারেন। প্রায়শই বলা হয়, বিদেশিরা থাকলে, তাঁদের বসিয়ে কোচেরা দেশি ফুটবলারদের খেলাতে চান না। সেই প্রেক্ষিতে মরশুমের প্রথম ডার্বি কিন্তু দুই দলের ভারতীয় প্লেয়ারদের কাছে নিজেদের চেনানোর মোক্ষম সুযোগ।
মোহনবাগান কোচ দিলেমপেরিস যেমন ডার্বিতে মনবীর সিংকে খেলাতে পারেন স্ট্রাইকারে। ঠিক তেমনই ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস আক্রমণভাগে ডেভিডকে খেলিয়ে দিলে, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ডার্বিতে জয় পেতে লাল-হলুদ কোচ তাকিয়ে থাকবেন এডমুন্ড-জিকসনদের দিকে। দিলেমপেরিসের অস্ত্র আবার হতে পারেন অনিরুধ থাপা-সাহাল আব্দুল সামাদ-লিস্টন কোলাসোরা। এত কম প্রস্তুতিতে হাবাস নিজেও বিদেশি প্লেয়ার খেলাতে অপারগ। বলে গেলেন, ‘‘তিন দিন অনুশীলন করেছি মাত্র। ডার্বিতে নামার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়নি। এত কম সময়ে প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করা কঠিন।’’ একটা সময় সবুজ-মেরুন জনতার নয়নের মণি ছিলেন হাবাস। আজ তিনি মোহনবাগানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে, ইস্টবেঙ্গলে। অদ্ভুত লাগছে না? হাবাস প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘‘আমি পেশাদার। মোহনবাগান জনতা আমাকে প্রচুর ভালোবাসা দিয়েছে। কিন্তু সেটা অতীত। পেশাদারি দুনিয়ায় আবেগের কোনও স্থান নেই।’’
পেশাদারি দুনিয়া কেন, ফুটবলেও বা কতটা স্থান আবেগের আছে, কে জানে। মহাযুদ্ধে আবেগই নির্ণায়ক হলে তো গত রবিবার লিওনেল মেসি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততেন। নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি করে নামা স্পেন নয়! শনিবারও মন বলছে, তাই হবে। দুই কোচের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্ট্র্যাটেজি যাঁর, ডার্বি তাঁর!
