বছরের পর বছর তীব্র পিরিয়ডের ব্যথা, তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা, অথচ একের পর এক পরীক্ষাতেও মিলছে না রোগের হদিশ। এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis)-এ আক্রান্ত বহু নারীর কাছে এটাই বাস্তব। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বায়ো হ্যাকার ব্রায়ান জনসন (Bryan Johnson)-এর সাম্প্রতিক দাবি নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। তাঁর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বিশেষ ধরনের এমআরআই বিশ্লেষণ, এন্ডোমেট্রিওসিস-স্পেসিফিক আল্ট্রাসাউন্ড এবং একটি নির্দিষ্ট রক্তপরীক্ষার সাহায্যে তাঁর সঙ্গী কেটের এন্ডোমেট্রিওসিস অস্ত্রোপচার ছাড়াই মাত্র ৪২ দিনের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি এআই এতটা সক্ষম?
কেন এত দেরিতে ধরা পড়ে এন্ডোমেট্রিওসিস?
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি রোগ, যেখানে জরায়ুর আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে। এর ফলে প্রদাহ, টিস্যুতে ক্ষত, তীব্র ব্যথা এবং অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় একজন এই রোগে আক্রান্ত।
রোগটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এর উপসর্গ অন্য অনেক রোগের সঙ্গে মিলে যায়। তীব্র মাসিকের ব্যথা, দীর্ঘদিন তলপেটের যন্ত্রণা, যৌনমিলনের সময় ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ক্লান্তি বা সন্তান ধারণে সমস্যা, এসব লক্ষণকে অনেক সময় অন্য সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ফলে অনেক নারী সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ৬ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
ব্রায়ান জনসন। রোগ নির্ণয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: সংগৃহীত
সাধারণ স্ক্যানে কেন ধরা পড়ে না?
ব্রায়ান জনসনের দাবি অনুযায়ী, কেটের প্রথমদিকে করা সাধারণ এমআরআই ও ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ডে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। চিকিৎসকদের মতে, এন্ডোমেট্রিওসিসের ছোট বা উপরিভাগের ক্ষত সাধারণ স্ক্যানে সহজে ধরা পড়ে না। তবে রোগটি যদি ডিম্বাশয় বা পেলভিসের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হয়।
দীর্ঘদিন ধরে ল্যাপারোস্কপিক অস্ত্রোপচারকেই এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর উপসর্গ এবং উন্নত মানের ইমেজিংয়ের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। তাই সব রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার অপরিহার্য নয়।
এআই কি বদলে দিতে পারে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়, তবে দক্ষ সহকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বর্তমানে এমন এআই প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, যা পেলভিক এমআরআই বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে ডিপ ইনফিলট্রেটিং এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এআই আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে, যদি তা অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা এমন রক্তপরীক্ষা নিয়েও গবেষণা করছেন, যেখানে বিভিন্ন বায়োমার্কার, প্রোটিন, হরমোন ও মাইক্রো-আরএনএ বিশ্লেষণ করে অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগ শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। যদিও এই পরীক্ষাগুলি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে নিয়মিত চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেনি।
দু'জনে। ছবি: সংগৃহীত
ভবিষ্যতের চিকিৎসা কি বহু পরীক্ষার সমন্বয়ে?
ব্রায়ান জনসনের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। একটি মাত্র পরীক্ষা নয়, বরং বিশেষজ্ঞের করা উন্নত আল্ট্রাসাউন্ড, এআই-সহায়তায় এমআরআই বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য বায়োমার্কার পরীক্ষা এবং রোগীর উপসর্গ একসঙ্গে মূল্যায়ন করলে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা অনেকটাই বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও এআই সফটওয়্যার বা রক্তপরীক্ষা একাই এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিত করতে পারে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন এখনও অপরিহার্য।
কী করবেন?
যদি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মাসিকের ব্যথা, তলপেটে অস্বাভাবিক যন্ত্রণা বা এন্ডোমেট্রিওসিসের অন্যান্য উপসর্গ থাকে, তাহলে শুধুমাত্র একটি সাধারণ স্ক্যান স্বাভাবিক এসেছে বলে নিশ্চিন্ত হবেন না। অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে ইমেজিং বা এন্ডোমেট্রিওসিস বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা হতে পারে।
এআই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তিকে এখনও সহায়ক হাতিয়ার হিসেবেই দেখা হচ্ছে, চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে নয়। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা সফল হলে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অনেকটাই সহজ হয়ে উঠতে পারে।
