সারাদিন মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে কি চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়?
এ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্ভরযোগ্য গবেষণালব্ধ প্রমাণ মেলেনি, যা বলে স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে বা ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে কাজ করার পর চোখে শুষ্কভাব, ঝাপসা দেখা, জ্বালা বা ক্লান্তি অনুভব করা একেবারেই বাস্তব। এর জন্য নীল আলো নয়, বরং স্ক্রিনের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকার অভ্যাসই দায়ী। কারণ, তখন আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পলক ফেলি এবং চোখের ফোকাস নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
তাহলে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো কি একেবারেই নিরাপদ?
চোখের স্বাস্থ্যের দিক থেকে বলতে গেলে, হ্যাঁ। স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলোর তীব্রতা দিনের স্বাভাবিক সূর্যালোকের তুলনায় অত্যন্ত কম। তবে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে ঘুমের উপর।
রাতে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করলে নীল আলো শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরের জৈবঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয় এবং ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে বাড়ছে চোখের অস্বস্তি। ছবি: সংগৃহীত
ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা কি সত্যিই উপকার করে?
বর্তমানে যে বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাতে দেখা যায় ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা চোখের ক্লান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায় না, আবার চোখকে বিশেষ কোনও সুরক্ষাও দেয় না। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ অপথ্যালমোলজি-ও বলছে, চোখের স্বাস্থ্য রক্ষার উপায় হিসাবে ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমার খুব একটা কার্যকর ভূমিকা নেই।
মূলত নীল আলোর ক্ষতি নিয়ে অতিরঞ্জিত প্রচারের সুযোগ নিয়েই এই ধরনের পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে। তবে কেউ যদি মনে করেন, রাতে এটি ব্যবহার করলে মানসিকভাবে আরাম পান বা ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হয়, তাতে আপত্তির কিছু নেই। শুধু চিকিৎসাগত উপকারের প্রত্যাশা করা উচিত নয়।
তা হলে সারাদিন কাজের শেষে চোখে এত অস্বস্তি কেন হয়?
এই সমস্যার নাম ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে কাজ করার ফলে কম পলক ফেলা, চোখের পেশির অতিরিক্ত ব্যবহার, স্ক্রিনের ঝলকানি, অনুপযুক্ত আলো, ভুল উচ্চতায় মনিটর রাখা বা পুরনো পাওয়ারের চশমা— এসব মিলিয়েই চোখে ক্লান্তি, শুষ্কভাব, মাথাব্যথা বা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে এই অস্বস্তি সাধারণত সাময়িক এবং সহজ কিছু অভ্যাসে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
নীল আলো নিয়ে কাটুক ভুল ধারণা। ছবি: সংগৃহীত
চোখের ক্লান্তি কমাবে কী করে?
২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন। অর্থাৎ, প্রতি ২০ মিনিট অন্তর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনও বস্তুর দিকে তাকান। কাজের ফাঁকে সচেতনভাবে বেশি পলক ফেলুন, স্ক্রিন চোখের সমতলের সামান্য নিচে রাখুন, পর্যাপ্ত আলোয় কাজ করুন এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করিয়ে সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করুন।
ঘুমের আগে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেওয়া বা কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে দূরে থাকাও ভালো অভ্যাস। আর বাইরে বের হলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে চোখ রক্ষায় ভালো মানের সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
মেনে চলুন ২০-২০-২০। ছবি: সংগৃহীত
নীল আলো নিয়ে এত ভুল ধারণা ছড়াল কেন?
কারণ বাস্তব সমস্যার সঙ্গে ভুল ব্যাখ্যা খুব সহজেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে চোখে যে অস্বস্তি হয়, অনেকেই তার জন্য নীল আলোকে দায়ী করেন। পরে বিভিন্ন পণ্যের বিপণন সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
ফলে চোখের ক্লান্তির আসল কারণ আড়ালে থেকে গিয়েছে, আর নীল আলো নিয়ে ভ্রান্ত ধারণাই বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞান বলছে, সমস্যাটি স্ক্রিনের আলো নয়—বরং আমরা কীভাবে এবং কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
