শিশুর ঘুম যেন এক রহস্যে ঘেরা। কেউ বলেন, বয়স ছ'মাস হলেই রাতভর ঘুমাবে। আবার কেউ বলেন, দিনে বেশি ঘুম ভালো না। চারপাশে এত পরামর্শ, এত নিয়ম- যে নতুন বাবা-মায়ের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, 'আমার সন্তান কি ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে?' বিজ্ঞান কিন্তু বলছে, বাস্তবটা অনেক বেশি স্বাভাবিক এবং সহজ। শিশুর ঘুম কোনও পরীক্ষার খাতা নয়, যেখানে নির্দিষ্ট নম্বর পেতেই হবে। বরং এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক জৈবিক প্রক্রিয়া। চলুন, ঘুম নিয়ে পাঁচটি বহুল প্রচলিত ধারণার ভেতরের সত্যিটা দেখি।
ছবি: সংগৃহীত
১. বেশিরভাগ শিশু রাতভর টানা ঘুমায় — বাস্তবে তা নয়
'স্লিপ থ্রু দ্যা নাইট' কথাটা অনেকের কাছে যেন সোনার পাথর বাটি। কিন্তু গবেষণা বলছে, ছ'মাস বয়সেও অধিকাংশ শিশু রাতে অন্তত একবার জেগে ওঠে। নরওয়েতে এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ছ'মাস বয়সি প্রায় ৭০% শিশু রাতে জাগে। এমনকী দেড় বছর বয়সেও চারজনে একজন অন্তত একবার রাতে জাগে। ফিনল্যান্ডের আরেক গবেষণায় তিন থেকে আট মাস বয়সি শিশুদের গড়ে দু'বারের বেশি জাগতে দেখা গিয়েছে। ভিডিও পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, বাবা–মা টের না পেলেও শিশুরা মাঝেমধ্যে জেগে আবার নিজে থেকেই ঘুমিয়ে পড়ে। ভালো দিক হল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জাগার সংখ্যা কমে আসে। বেশিরভাগ শিশু সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই দীর্ঘ সময় ঘুমোতে শেখে।
ছবি: সংগৃহীত
২. সব রাতের জাগাকে 'স্বাভাবিক' বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়
শিশু জাগলেই তাকে 'অভ্যাসের সমস্যা' বলা সহজ। কিন্তু কখনও কখনও শারীরিক কারণও থাকতে পারে। আয়রনের ঘাটতি, খাবারে অ্যালার্জি, রিফ্লাক্স, কানের সংক্রমণ কিংবা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা শিশুর ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণা বলছে, প্রায় ৬% শিশুর মধ্যে স্লিপ অ্যাপনিয়া দেখা যায়। তাই রাতের জাগা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করলেও, যদি ঘন ঘন অস্বস্তি বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ছবি: সংগৃহীত
৩. রাতে ১২ ঘণ্টা ঘুমই আদর্শ — এমন বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই
সব শিশুর শরীর একভাবে কাজ করে না। অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্ম থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের গড় রাতের ঘুম ১১ ঘণ্টার মতো। অন্য়দিকে এশীয় দেশে এই সময় আরও কম। আমেরিকান অ্য়াকাডেমি অফ স্লিপ মেডিসিনের তথ্য় বলছে, ৪–১২ মাস বয়সে শিশুর ১২–১৬ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট, আর ১-২ বছরে ১১–১৪ ঘণ্টা। এর কতটা দিনে আর কতটা রাতে, তা শিশুভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোনও শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঘুম পাড়ানো উচিত নয়। এতে ঘুমাতে দেরি, রাতে বারবার জেগে যাওয়া, খুব ভোরে উঠে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
৪. কোলে, গাড়িতে বা দোলনায় ঘুম স্বাস্থ্য়কর নয় — এমন প্রমাণ নেই
অনেকে মনে করেন, চলন্ত অবস্থায় ঘুম মানে হালকা ঘুম। কিন্তু বিজ্ঞান তা সমর্থন করে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, মৃদু দোলায় শিশুরা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে এবং কম কাঁদে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, মৃদু দোলা গভীর ঘুম বাড়াতে সাহায্য করে। এটা অস্বাভাবিকও নয়। গর্ভে থাকাকালীন শিশুরা প্রায় ৯০% সময়ই ঘুমিয়ে কাটায়, আর মায়ের নড়াচড়ার সঙ্গে নিয়মিত দুলতে থাকে। তাই কোলে ঘুম মানেই ঘুম ভাল হবে না—এই ধারণার কোনও ভিত্তি নেই।
ছবি: সংগৃহীত
৫. দিনে বেশি ঘুম মানে রাতেও বেশি ঘুম— সব সময় সত্য নয়
কিছু শিশু অতিরিক্ত ক্লান্ত হলে অস্থির হয়ে পড়ে, এটা ঠিক। কিন্তু দিনে বেশি ঘুমোলেই রাতে বেশি ঘুম হবে—এমন সরল সমীকরণ সাধারণত কাজ করে না। দু-বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেদিন তারা দুপুরে ঘুমোয়, সেদিন রাতে ঘুমোতে দেরি হয় এবং মাঝরাতে জেগে যায়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দিনের বাড়তি ঘুম, রাতে সামান্যই ঘুম বাড়ায়। ঘুমের পেছনে কাজ করে 'স্লিপ প্রেসার'। যত বেশি সময় জেগে থাকা, ঘুমের প্রয়োজন তত বাড়ে। দিনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুম হলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হওয়াই স্বাভাবিক।
শিশুর ঘুম কোনও প্রতিযোগিতা নয়। কারও বাচ্চা ছ'মাস বয়স থেকে টানা ঘুমোয়, কারও বাচ্চা এক বছর বয়সেও রাতে জেগে ওঠে—দুটোই স্বাভাবিক হতে পারে। শিশুর শরীর তার নিজের ছন্দে কাজ করে। তাকে জোর করে নির্দিষ্ট ছকে ফেলা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। ধৈর্য আর বোঝাপড়া—শিশুর ঘুম নিয়ে অকারণ চাপ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
