ধরা যাক, মন দিয়ে বই পড়ছিলেন। হঠাৎ কানে এল মোবাইলের মৃদু ‘টুং’! এ আওয়াজের অর্থ, আপনার সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটিতে নোটিফিকেশন ঢুকল। সত্যি বলুন তো, এই আওয়াজ শুনেও কিছুতেই ফোনের দিকে চোখ ফেরাবেন না, অথবা হাতের বই সরিয়ে রেখে মোবাইল নিয়ে বসবেন না— কতজন রয়েছেন এমন?
যদি সত্যি করেই ফোনে হাত না দেন, তাহলেও মন বসাতে পারবেন না কাজে। সারাক্ষণ মাথার ভিতর চলতেই থাকবে, সদ্য পোস্ট করা ছবিটিতে নতুন কে কে কমেন্ট করল? বন্ধুরা কোনও গ্রুপ ফটোতে ট্যাগ করল কি? কিংবা, এই যতক্ষণ ‘অফলাইন’-এ রয়েছেন আপনি, ততক্ষণ ঠিক কী কী ঘটে যাচ্ছে দুনিয়া জুড়ে?
নোটিফিকেশনের সামান্য আওয়াজে অদ্ভুত চঞ্চলতা তৈরি হচ্ছে মনের ভিতর।
মনোবিদদের মতে, এই অদ্ভুত ধরনের নেশার নাম ‘নোটিফিকেশন অ্যাংজাইটি’। নোটিফিকেশন এসেছে তা বুঝতে পারলে, কিছুতেই ফোনের থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন না এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষেরা। আর একবার সোশাল মিডিয়ায় ঢোকা মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেবল কেটে যাবে স্ক্রোল করেই! শুধুমাত্র কর্মহীন বসে থাকলেই যে এমনটা হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। রীতিমতো ভিড় ট্রেনে-বাস অথবা অফিসে কাজের চূড়ান্ত চাপের মধ্যেও এই উদ্বেগ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মানুষকে। নোটিফিকেশনের সামান্য আওয়াজে অদ্ভুত চঞ্চলতা তৈরি হচ্ছে মনের ভিতর। যেন এক্ষুণি সে নোটিফিকেশন চেক না করলেই নয়!
আর এ কারণেই দ্রুত কমে যাচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি কথোপকথন। মনোবিদেরা বলছেন, বহুক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এক বাড়িতে এক ঘরে বসেও যে যার মতো ফোনে বুঁদ হয়ে রয়েছে বাড়ির সদস্যরা। ঘরে থাকা অন্য মানুষটির সঙ্গে কথা বলার বিন্দুমাত্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না কেউই। হয়তো একজন অসুস্থ হলেও অন্যজন তাতে নির্লিপ্ত হয়ে থাকছে। বাড়ির কাজে সময় নষ্ট করার চাইতে সোশাল মিডিয়ায় কী ঘটছে, সে চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। ভার্চুয়ালি মিশতে চাওয়ার ইচ্ছেই তাদেরকে একঘরে করে ফেলছে গোটা সমাজের থেকে।
তবে কি এ থেকে বাঁচার উপায় নেই? মনোবিদদের মতে, মানসিক দৃঢ়তাই একমাত্র পথ। যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন প্রভৃতি মনকে শান্ত করে। একাগ্রতা বাড়ায়, মানসিক চঞ্চলতা নিয়ন্ত্রণ করে। বই পড়া, বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলা অথবা খাওয়ার সময় জোর করেই দূরে রাখতে হবে মোবাইল ফোন। রাতে শোয়ার সময় মাথার পাশে নিয়ে শুলে চলবে না। থাকলেও পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে হবে। একান্ত তা না-পারা গেলে সুইচ অফ করে রাখতে পারা যায় সারা রাত। নিজের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন প্রতিদিন, যে সময়টায় সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখবেন। সে সময় পেরিয়ে গেলেই এক্কেবারে স্টপ!
বই পড়ার সময় জোর করেই দূরে রাখতে হবে মোবাইল ফোন
‘নোটিফিকেশন অ্যাংজাইটি’ আদতে ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’-এরই অংশ। সারাক্ষণ যেন তাড়া করে বেড়ায় এক অদৃশ্য ভয়— চারদিকে যা চলছে, তা না জানলেই পিছিয়ে পড়তে হবে! সমাজে টিকে থাকলে চাইলে মুহুর্মুহু আপডেট করে চলতে হবে নিজেকে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আপাতভাবে সাধারণ লাগলেও চূড়ান্ত অবসাদ ও মানসিক বিষাদের আগের পর্যায় এই অ্যাংজাইটি। শুরুতেই তা নিয়ন্ত্রণ না করলে আগামী দিনে খাওয়া, ঘুম, ব্যক্তিগত জীবন— ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবকিছুই। আর সত্যি বলতে, কঠিন নয়, এই ভয়াবহ মানসিক রোগের থেকে বাঁচার সহজ চাবিকাঠি রয়েছে আপনার হাতেই!
