একটি ভাইরাসের সংক্রমণ শেষ হয়ে গেলেও তার গল্প সবসময় শেষ হয় না। শরীরে থেকে যেতে পারে কিছু ভাইরাস, বছরের পর বছর নীরবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাই কোনও উপসর্গও দেখা যায় না। কিন্তু শরীর যখন গুরুতর অসুস্থতার ধাক্কা সামলায়, তখন সেই ‘ঘুমিয়ে থাকা’ ভাইরাসগুলির কেউ কেউ আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। নতুন গবেষণায় কোভিড-১৯ (Covid 19)-এর সঙ্গে এমনই একটি যোগসূত্রের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
'নেচার' পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কোভিড-১৯ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বহু রোগীর শরীরে আগে থেকে থাকা কয়েকটি ভাইরাস আবার সক্রিয় হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ভাইরাসগুলির পুনঃসক্রিয়তা শুধু যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্পষ্টভাবে দুর্বল, তাঁদের মধ্যেই দেখা যায়নি। তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই ফলাফল থেকে এখনও বলা যায় না যে পুনরায় সক্রিয় হওয়া ভাইরাসই কোভিডের তীব্রতা বা লং কোভিডের কারণ।
শরীরে ‘ঘুমিয়ে’ থাকে ভাইরাস?
সব ভাইরাস সংক্রমণের পর শরীর থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায় না। কিছু ভাইরাস শরীরের কোষে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থেকে যেতে পারে। হারপিস পরিবারের ভাইরাস এর অন্যতম উদাহরণ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত এগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
কোভিড ১৯ নিয়ে নতুন গবেষণা। ছবি: সংগৃহীত
কিন্তু গুরুতর অসুস্থতা বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সময় সেই নিয়ন্ত্রণ কিছুটা দুর্বল হতে পারে। তখন শরীরে আগে থেকেই থাকা ভাইরাস আবার সক্রিয় হয়ে ভাইরাল উপাদান তৈরি করতে শুরু করে। এই ঘটনাকেই বলা হয় ভাইরাল রিঅ্যাক্টিভেশন বা ভাইরাসের পুনঃসক্রিয়তা। অর্থাৎ, এটি নতুন করে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নয়। শরীরে আগে থেকে থাকা ভাইরাসের আবার সক্রিয় হয়ে ওঠা।
১,১৫৪ জন কোভিড রোগীর শরীরে কী দেখা গেল?
গবেষণায় আমেরিকার ২০টি হাসপাতালে ভর্তি ১,১৫৪ জন কোভিড রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২০ সালের মে থেকে ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসপাতালে থাকার সময় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত তাঁদের পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকরা রক্ত, নাকের সোয়াব এবং কিছু গুরুতর অসুস্থ রোগীর শ্বাসনালির নমুনা পরীক্ষা করেন। জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে SARS-CoV-2-এর পাশাপাশি শরীরে অন্য ভাইরাসের উপস্থিতিরও খোঁজ করা হয়।
ফলাফল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য পাওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৭.৯ শতাংশের শরীরে কোভিডের তীব্র পর্যায়ে অন্তত একটি ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
কোন কোন ভাইরাস আবার সক্রিয় হয়েছিল?
গবেষণায় এপস্টাইন-বার ভাইরাস (ইবিভি), সাইটোমেগালো ভাইরাস (সিএমভি), হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস-১ (এইচএসভি-১) এবং অ্যানেলোভিরিডে পরিবারের ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ইবিভি অত্যন্ত সাধারণ একটি ভাইরাস, যা সংক্রামক মনোনিউক্লিওসিসের কারণ হতে পারে। সিএমভি-ও শরীরে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। এইচসিভি-১ সাধারণত ঠোঁট বা মুখের আশপাশে কোল্ড সোরের সঙ্গে যুক্ত।
তবে সব ভাইরাস একই সময়ে সক্রিয় হয়নি। ইবিভি তুলনামূলকভাবে কোভিডের প্রথম দিকেই বেশি সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে এইচসিভি-১ এবং সিএমভি পরবর্তী পর্যায়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, কোভিডের সময় শরীরে ভাইরাসগুলির আচরণও একরকম ছিল না।
দরকার আরও গবেষণার। ছবি: সংগৃহীত
লং কোভিডের রহস্য কি কিছুটা খুলছে?
গবেষণায় কয়েকটি ভাইরাসের পুনঃসক্রিয়তার সঙ্গে গুরুতর কোভিড, বিভিন্ন জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। বিশেষ করে অ্যানেলোভিরিডে, সিএমভি, ইবিভি এবং এইচএসভি-১-এর ভাইরাল সংকেত রোগের তীব্রতার বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রয়েছে। যোগসূত্র পাওয়া আর কারণ প্রমাণ করা এক কথা নয়। গবেষকরা এখনও বলতে পারছেন না, ভাইরাসগুলি পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কারণেই কোভিড গুরুতর হয়েছিল, নাকি গুরুতর কোভিডের কারণেই এই ভাইরাসগুলি সক্রিয় হয়েছিল।
লং কোভিডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গবেষণাটি একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করেনি।
তবু এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে শুধু করোনা ভাইরাসকে দেখলেই হবে না, শরীরে আগে থেকেই নীরবে থাকা অন্য ভাইরাসগুলির আচরণও নজরে রাখতে হতে পারে। ভবিষ্যতের গবেষণা হয়তো আরও স্পষ্ট করে জানাবে, কোভিডের পর দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পেছনে এই ‘ঘুমিয়ে থাকা’ ভাইরাসগুলির ভূমিকা কতটা।
