স্টেরয়েড। যা একাধিক অসুখে সুরাহা দেয়, আবার অন্যদিকে ডেকে আনে অন্য সমস্যাও। অনেকেই বলেন সাইড এফেক্ট আছে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সৌমাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন কখন স্টেরয়েড ভালো, কখন মারাত্মক।
চিনে নিন
স্টেরয়েড একধরনের হরমোন। এটি মানবশরীরে অ্যাড্রিন্যাল গ্ল্যান্ডে তৈরি হয়। এই হরমোনের প্রধান কাজ হল শরীরে জল ও নুনের পরিমাণ ঠিক রাখা, রক্তচাপ ঠিক রাখা, সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা, রিপ্রোডাকটিভফাংশন নিয়ন্ত্রণ করা। তবে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শরীরে যখন কোনও অসুখের কারণে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হয়, তখন স্টেরয়েড হরমোন তা কমাতে সাহায্য করে। তবে সবার আগে যে অসুখের জন্য প্রদাহ হচ্ছে, সেই অসুখের চিকিৎসা দরকার। তার সঙ্গে স্টেরয়েড দিতে হবে। এই ধরনের অসুখেই মূলত স্টেরয়েড ভালো কাজ করে।
দুটি কারণে বাইরে থেকে স্টেরয়েড দেওয়ার প্রয়োজন হয়। প্রথমত, শরীরে যতটা তৈরি হওয়া দরকার, স্টেরয়েড তার চেয়ে কম তৈরি হলে। দ্বিতীয়ত, যতটুকু স্টেরয়েড তৈরি হচ্ছে, তা শরীরকে পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট না হলে। বেশ কিছু অসুখ রয়েছে, যেগুলিতে বাইরে থেকে অতিরিক্ত স্টেরয়েড দরকার পড়ে। যেমন ব্রংকিয়াল অ্যাস্থামা (শ্বাসকষ্ট), টেম্পুরাল আর্টেরাইটিস (ধমনিতে প্রদাহ তৈরি হওয়া), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লিউপাস। এছাড়া অ্যাড্রিনোকোর্টিক্যাল ইনসাফিসিয়েন্সি, অটোইমিউন ডিসঅর্ডার, নেফ্রোটিক সিনড্রোমের মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঠিক ওষুধ এবং রুটিন টেস্ট করা জরুরি।
শরীরে তিনধরনের স্টেরয়েড হরমোন তৈরি হয়। যদি কারও ক্ষেত্রে সঠিক বিবেচনা না করে বাইরে থেকে স্টেরয়েড ইনজেকশন বা ট্যাবলেট দেওয়া হয় তাহলে শরীর স্বাভাবিক নিয়মে যে স্টেরয়েড তৈরি করত, সেটা তৈরি করা বন্ধ করে দেবে। ফলত, হঠাৎ করে যেদিন স্টেরয়েড ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন কিন্তু স্বাভাবিক মাত্রায় অ্যাড্রিন্যাল প্ল্যান্ড আর স্টেরয়েড তৈরি করতে পারবে না। ফলে সেই ব্যক্তি শক স্টেজে চলে যায়। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় অ্যাডিনোকর্টিকল ক্রাইসিস। এতে করে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আবার বেশি পরিমাণে স্টেরয়েড হরমোন দীর্ঘদিন বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করলে তার জন্য সুগার, প্রেশার বাড়তে পারে, হাড়ের ক্ষয়, চোখে ছানির সমস্যা দেখা দেয়। তাই স্টেরয়েড চিকিৎসকের পরামর্শ মেপে যতদিন, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নেওয়া উচিত।
অতিরিক্ত একেবারেই নয়। লাইফ সেভার যে কোনও মৃত্যুর পিছনে কোনও সংক্রমণ, হার্ট অ্যাটাক অথবা কোনও রকম অ্যাকসিডেন্ট দায়ী হতে পারে। এই সব ক্ষেত্রেই শরীরে স্ট্রম বা ঝড় বয়ে যায়। অর্থাৎ ম্যাসিভ ইনফ্লামেশন বা বিশাল প্রদাহ তৈরি হয়। এই প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব স্টেরয়েড দ্বারা। এমন জটিল পরিস্থিতিতে স্টেরয়েড রোগীকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে কিছু কিছু অসুখ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে তখন স্টেরয়েড গেম চেঞ্জারের ভূমিকা নেয় না, হিতে-বিপরীতও হতে পারে। তাই খুব বুঝে এই প্রয়োগ দরকার। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু 'হাটুরে চিকিৎসক' সামান্য জ্বর সর্দি হলেও সেখানে স্টেরয়েড ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন, এতে রোগের প্রকোপ বা প্রদাহ হয়তো কমছে কিন্তু ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শরীরের ইমিউন সিস্টেম। তাই যেখানে দরকার নেই সেখানে অযাচিতভাবে এই ওষুধের প্রয়োগ বিপজ্জনক।
বেশ কিছু নন অ্যালোপ্যাথিক ওষুধে স্টেরয়েড থাকে। বিশেষত যে ওষুধগুলো খুব তাড়াতাড়ি সুরাহা দেয়, সেগুলিতে ওষুষের কম্পোজিশনও লেখা থাকে না। এগুলি বুঝে খাওয়া জরুরি। এ ছাড়া বেশ কিছু ত্বকের ওষুধ বা মলমে স্টেরয়েড থাকে। তাই ওষুধ যতদিন চিকিৎসক বলবেন ততদিনই তা ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত ব্যবহারে স্টেরয়েড শরীরের ভালোর চেয়ে ক্ষতিই করে।
শরীরচর্চায় নো স্টেরয়েড
আজকাল সুন্দর চেহারা পাওয়ার আশায় অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা জিমে যাচ্ছে এবং সেখানে নানা রকম অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার করছে। খুব অল্প সময়ে চেহারা পরিবর্তন করা বা সেই চেহারা ধরে রাখার জন্য দীর্ঘদিন এই ধরনের স্টেরয়েড ব্যবহার করছেন অনেকেই। এর ফলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম অচিরেই ভেঙে পড়ে এবং এর প্রভাব এক এক করে পড়ছে কিডনি থেকে চোখে।
