মুখ যেন কাঁচের মতো চকচকে, দাগহীন, মসৃণ আর আলো ঝলমলে—এখনকার সৌন্দর্যের দুনিয়ায় এটাই ‘গ্লাস স্কিন’। দক্ষিণ কোরিয়ার স্কিনকেয়ার ট্রেন্ড থেকে জনপ্রিয় হওয়া এই ধারণা এখন সোশাল মিডিয়া জুড়ে একপ্রকার নেশায় পরিণত হয়েছে। তবে ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে দেখা সেই তথাকথিত 'পারফেক্ট স্কিন'-এর বড় অংশই বাস্তব নয়।
ফিল্টার, এডিটিং, মেকআপ এবং বিশেষ আলোয় তৈরি সেই নিখুঁত ত্বকের ছবি দেখে অনেকেই নিজের স্বাভাবিক ত্বক নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন। ফলে বাড়ছে বিভিন্ন ত্বকের রোগের সম্ভাবনা।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, আগে যেখানে মানুষ শুধু ব্রণ বা দাগের চিকিৎসার জন্য আসতেন, এখন অনেকেই সরাসরি 'গ্লাস স্কিন' চাইছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও সেলিব্রিটিদের স্কিনকেয়ার রুটিন দেখে প্রভাবিত হচ্ছেন।
এমন ত্বক চাই? ছবি: সংগৃহীত
কী এই গ্লাস স্কিন?
গ্লাস স্কিন বলতে এমন ত্বককে বোঝানো হয় যা অত্যন্ত হাইড্রেটেড, টানটান, উজ্জ্বল এবং প্রায় কাঁচের মতো প্রতিফলিত দেখায়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবে মানুষের ত্বকে রোমছিদ্র, সামান্য টেক্সচার বা রঙের তারতম্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই 'একেবারে নিখুঁত' ত্বকের পেছনে ছোটা অনেক সময় অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে।
কেন এই ট্রেন্ড এত বাড়ছে?
ইনস্টাগ্রাম, রিলস ও বিউটি কনটেন্টের দুনিয়ায় এখন স্কিনকেয়ার অন্যতম বড় ট্রেন্ড। শুধু মেকআপ নয়, এখন মানুষ ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বাড়ানোর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
বর্তমানে যেসব ট্রিটমেন্টের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি—
- হাইড্রেটিং ফেশিয়াল
- কেমিক্যাল পিল
- লেজার স্কিন রিজুভেনেশন
- হায়ালুরোনিক অ্যাসিড স্কিন বুস্টার
- মাইক্রোনিডলিং
- স্কিন ব্যারিয়ার রিপেয়ার থেরাপি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিকিৎসাগুলির মূল উদ্দেশ্য হল ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা, টেক্সচার উন্নত করা এবং স্বাস্থ্যকর গ্লো ফিরিয়ে আনা।
অতিরিক্ত নয়, দরকার সঠিক যত্ন। ছবি: সংগৃহীত
অতিরিক্ত স্কিনকেয়ারেই বাড়তে পারে ক্ষতি
চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল, সোশাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্ক্রাব, অ্যাসিড বা স্কিনকেয়ার ব্যবহার করছেন। এতে ত্বকের ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এই স্কিন ব্যারিয়ারই ত্বককে দূষণ, শুষ্কতা ও ক্ষতিকর উপাদান থেকে রক্ষা করে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেখা দিতে পারে—
- ব্রণ
- লালচেভাব
- জ্বালা
- অতিরিক্ত শুষ্কতা
- সংবেদনশীলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লাস স্কিন পাওয়ার তাড়নায় অতিরিক্ত ট্রিটমেন্ট করলে উলটে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
সুস্থ ত্বকের জন্য জরুরি পরিমিত জলপান। ছবি: সংগৃহীত
সবাই কি ‘গ্লাস স্কিন’ পেতে পারেন?
চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য, প্রত্যেকের ত্বক আলাদা। জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোন, বয়স, জীবনযাপন ও পরিবেশ—সবকিছুই ত্বকের উপর প্রভাব ফেলে। তাই অন্যের ত্বকের সঙ্গে নিজের তুলনা না করে, নিজের ত্বককে সুস্থ রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতীয় ত্বকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বদলে সঠিক স্কিনকেয়ার রুটিন, পর্যাপ্ত জলপান ও সানস্ক্রিন ব্যবহারের উপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
‘পারফেক্ট’ নয়, সুস্থ ত্বকই আসল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সময় এসেছে সোশাল মিডিয়ার ফিল্টার-নির্ভর সৌন্দর্যের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার। কারণ বাস্তব ত্বক কখনও পুরোপুরি দাগহীন হয় না। সুস্থ, সঠিক পরিচর্যা এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বল ত্বকই হওয়া উচিত আসল লক্ষ্য, ‘পারফেক্ট স্কিন’ নয়।
