একসময় স্টেজ কাঁপানো তারকা, তারপর দীর্ঘ অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া— ইয়ো ইয়ো হানি সিংয়ের জীবন যেন সিনেমার গল্প। সম্প্রতি এক পডকাস্টে নিজের মানসিক অসুস্থতা, ভয়, একাকিত্ব আর শরীরের ভয়াবহ পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন জনপ্রিয় গায়ক-র্যাপার।
হানি সিং জানান, বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Honey Singh Bipolar Disorder) ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি প্রায় সাত বছর ঘরবন্দি করে পড়েছিলেন। 'টানা তিন বছর আমি বেডরুমের বাইরে বেরোইনি। এমনকী স্নান করার সময়ও বাথরুমের দরজা খোলা রাখতাম। সবসময় মনে হতো, আমি হয়তো মারা যাব', বলেন তিনি।
হানি সিং। ছবি: সংগৃহীত
তাঁর কথায়, বাইপোলার ডিসঅর্ডার মানুষকে এমন সব ভয় ও ধ্বংসাত্মক চিন্তার মধ্যে ঠেলে দেয়, যা বাস্তবে না থাকলেও সত্যি বলে মনে হয়। তবে মানসিক যন্ত্রণার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের চিকিৎসা তাঁর শরীরেও বড় প্রভাব ফেলেছিল। হানি সিং-এর কথায়, 'সাত বছর ধরে উচ্চ ডোজের ওষুধ খেয়েছি। আমার ওজন ১০৫ কেজি হয়ে যায়। আর পুরো চুল উঠে যায়। এখন যা দেখছেন, সবটাই উইগ।'
তাঁর এই কথার পর আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা কি সত্যিই চুল পড়ার কারণ হতে পারে? মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর হ্যাঁ। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু মুড স্ট্যাবিলাইজার ও সাইকিয়াট্রিক ওষুধ শরীরের স্বাভাবিক হেয়ার গ্রোথ সাইকেলে প্রভাব ফেলে। ফলে চুলের ফলিকল 'রেস্টিং ফেজ'-এ চলে যায় এবং কয়েক মাস পর হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু হতে পারে।
মঞ্চে গায়ক-র্যাপার। ছবি: সংগৃহীত
শুধু ওষুধ নয়, এই রোগের সঙ্গে থাকা দীর্ঘ স্ট্রেস, উদ্বেগ, অনিদ্রা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, পুষ্টির অভাব এবং মানসিক ক্লান্তিও চুলের ক্ষতির বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চুল পড়া বা ওজন বাড়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখলেই নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ বন্ধ করা বিপজ্জনক। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন, সঠিক ডায়েট, সাপ্লিমেন্ট, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রায় বদল আনলে অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্যা সামলানো সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরনের চুল পড়া সাময়িক এবং সঠিক চিকিৎসা ও যত্নে আবার চুল ফিরে আসতে পারে।
কী এই বাইপোলার ডিসঅর্ডার?
বাইপোলার ডিসঅর্ডার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অসুস্থতা, যেখানে মানুষের মুড, আচরণ ও চিন্তাভাবনায় তীব্র ওঠানামা দেখা যায়। কখনও রোগী অতিরিক্ত উত্তেজিত, আত্মবিশ্বাসী বা চঞ্চল হয়ে পড়েন, আবার কখনও গভীর হতাশা ও অবসাদে ডুবে যান।
উপসর্গ
১. ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়া পর্যায়ে
- অস্বাভাবিক এনার্জি ও উত্তেজনা
- খুব দ্রুত কথা বলা বা এলোমেলো চিন্তা
- কম ঘুমিয়েও ক্লান্ত না লাগা
- ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়া
- অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা রাগ
ফিরুক জীবনের ছন্দ। ছবি: সংগৃহীত
২. ডিপ্রেশন পর্যায়ে
- দীর্ঘদিন মন খারাপ
- কোনও কিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া
- ক্লান্তি, অবসাদ
- মনোযোগে সমস্যা
- আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত আসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে বাইপোলার ডিসঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত থেরাপি, ওষুধ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং পরিবারের সমর্থন থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও স্বাভাবিক, স্থিতিশীল ও সফল জীবন কাটাতে পারেন।
