একসময় আর্থ্রাইটিসকে শুধুই বার্ধক্যের রোগ বলে মনে করা হত। কিন্তু সেই ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এখন তিরিশ বা চল্লিশের কোঠাতেও অনেকের মধ্যে দেখা দিচ্ছে হাড়ের ক্ষয়। এর অন্যতম বড় কারণ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন।
বয়স, বংশগত কারণ বা পুরনো আঘাতের মতো বিষয় এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অতিরিক্ত ওজন সন্ধিস্থল বা জয়েন্টের ক্ষয়কে অনেকটাই ত্বরান্বিত করে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও চলাফেরার সমস্যা অনেক কম বয়সেই শুরু হতে পারে।
সন্ধিস্থলে উপর বাড়তি চাপ
স্থূলতা মূলত দু'ভাবে সন্ধিস্থলের ক্ষতি করে। প্রথমত, শরীরের অতিরিক্ত ওজন হাঁটু, গোড়ালি ও কোমরের মতো ওজন বহনকারী সন্ধিস্থলগুলির উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা চেয়ার থেকে ওঠার মতো সাধারণ কাজেও হাঁটুর উপর শরীরের ওজনের কয়েক গুণ বেশি চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এই চাপ পড়তে থাকলে সন্ধিস্থলের তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ ক্ষয়ে যায়। তখন হাড়ের সঙ্গে হাড়ের ঘর্ষণ বেড়ে ব্যথা, ফোলাভাব, জোড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দেয়।
যত কাণ্ড ওজনে! ছবি: সংগৃহীত
স্থূলতা কেন প্রদাহ বাড়ায়?
অতিরিক্ত ওজনই একমাত্র সমস্যা নয়। শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি সাইটোকাইন নামে প্রদাহ সৃষ্টিকারী কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। এগুলি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বাড়ায় সন্ধিস্থলের ক্ষয়। এই কারণেই অনেক সময় হাতের আঙুলের মতো ওজন বহন না করা সন্ধিস্থলেও আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
কম বয়সে কেন বাড়ছে রোগ?
চিকিৎসকদের মতে, শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্থূলতার হার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। কৈশোর থেকেই অতিরিক্ত ওজন থাকলে বেড়ে ওঠার সময় সন্ধিস্থলগুলির উপর দীর্ঘদিন চাপ পড়ে। ফলে আগের তুলনায় অনেক কম বয়সেই হাঁটুর ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এখন অর্থোপেডিক চিকিৎসকদের কাছে ৪০ বছরের কম বয়সি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
যে কারণে বাড়ছে ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব পড়ে?
আর্থ্রাইটিস শুধু সন্ধিস্থলের ব্যথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে অনেকেই হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা শরীরচর্চা কমিয়ে দেন। এতে সন্ধিস্থলের আশপাশের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যথা আরও বাড়ে। ধীরে ধীরে ঘরের কাজ, কর্মজীবন, ঘুম এমনকী মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
ওজন কমালেই মিলতে পারে স্বস্তি
আর্থ্রাইটিসের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, এর অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ স্থূলতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেই হাঁটুর উপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, ব্যথা হ্রাস পায় এবং জয়েন্টের কার্যক্ষমতা উন্নত হয়।
হালকা শরীরচর্চা করাই যায়। ছবি: সংগৃহীত
আর্থ্রাইটিসে কি ব্যায়াম করা যায়?
অনেকেই মনে করেন, আর্থ্রাইটিস থাকলে ব্যায়াম করা উচিত নয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ বিশ্রাম বরং সমস্যা বাড়ায়। তাই হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানো, সাঁতারের মতো হালকা শরীরচর্চা করাই যায়। এছাড়া ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামও করতে পারেন। এগুলি সন্ধিস্থলের উপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে চলাফেরার ক্ষমতা ও পেশির শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
কয়েক সপ্তাহ ধরে হাঁটুর ব্যথা, সকালে সন্ধিস্থল শক্ত হয়ে থাকা, ফোলাভাব, সিঁড়ি ভাঙতে অসুবিধা ইত্যাদিকে বয়সের অজুহাতে এড়িয়ে যাবেন না। প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে আর্থ্রাইটিসের অগ্রগতি অনেকটাই ধীর করা সম্ভব। তাই আর্থ্রাইটিসকে আর শুধু বয়স্কদের রোগ ভেবে বসে থাকলে চলবে না; স্থূলতা নিয়ন্ত্রণই হতে পারে সুস্থ সন্ধিস্থলের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
