হার্ট অ্যাটাকের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুক চেপে ধরা অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু বাস্তবে অনেক হার্ট অ্যাটাকই শুরু হয় নিঃশব্দে। বুকে তীব্র ব্যথা ছাড়াই শরীর একের পর এক সতর্কবার্তা দিতে থাকে।
কখনও শ্বাসকষ্ট, কখনও চোয়ালে ব্যথা, আবার কখনও অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা বমিভাব। এই উপসর্গগুলিকে গ্যাস, অম্বল, বদহজম বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে গেলে মূল্য দিতে হতে পারে জীবন দিয়ে।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের নীরব লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ, যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, তত বেশি হৃদ্পেশি বাঁচানো সম্ভব।
ঘাড়ে ব্যথাও লক্ষণ হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
হার্ট অ্যাটাক আসলে কী?
হৃদ্যন্ত্রে রক্ত বহনকারী ধমনির কোনও একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে হৃদ্পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক। দ্রুত চিকিৎসা না হলে হৃদ্পেশির কোষ নষ্ট হতে শুরু করে এবং সেই ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই আর পূরণ করা যায় না।
যদিও বুকে ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ, কিন্তু সব রোগীর ক্ষেত্রে তা হয় না। কারও শুধু বুকে চাপ, ভারী লাগা বা অস্বস্তি হয়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে বুকে কোনও ব্যথাই থাকে না।
কোন লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না?
নিচের যে কোনও উপসর্গ হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত হতে পারে-
- বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও শ্বাসকষ্ট
- চোয়াল, ঘাড়, কাঁধ, পিঠের উপরের অংশ বা বাঁ হাতে ব্যথা বা অস্বস্তি
- হঠাৎ বমিভাব বা বমি
- প্রচণ্ড ঘাম
- মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব
- অকারণে দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- বুকে তীব্র ব্যথার বদলে চাপ, ভারী লাগা বা টানটান অনুভূতি
এই লক্ষণগুলি একসঙ্গে দেখা দিতে পারে, আবার আলাদাভাবেও হতে পারে। কখনও কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, কখনও কিছুক্ষণ কমে আবার ফিরে আসে।
জরুরি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ। ছবি: সংগৃহীত
কেন অনেকেই গ্যাস বা অম্বল ভেবে ভুল করেন?
হৃদ্যন্ত্র এবং পাকস্থলীসহ শরীরের আরও কয়েকটি অঙ্গের স্নায়ুপথের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। তাই হার্টের ব্যথাকে অনেক সময় মস্তিষ্ক পেট, চোয়াল, কাঁধ বা পিঠের ব্যথা বলে ব্যাখ্যা করে।
ফলে অনেকেই মনে করেন গ্যাস হয়েছে, অম্বল হয়েছে বা বদহজমের সমস্যা। কিন্তু এই ভুল ধারণার কারণেই হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়। আর প্রতিটি দেরি হওয়া মিনিট হৃদ্পেশির আরও ক্ষতি ডেকে আনে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
এই সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মহিলাদের, বয়স্কদের এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে।
মহিলাদের ক্ষেত্রে বুকে ব্যথার বদলে চোয়াল বা পিঠে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিই প্রথম লক্ষণ হতে পারে।
ডায়াবেটিসে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি হয়। ফলে ব্যথা অনুভবের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার বয়স্কদের ক্ষেত্রে বুকব্যথার পরিবর্তে বিভ্রান্তি, দুর্বলতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ শ্বাসকষ্টই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র ইঙ্গিত হতে পারে।
ব্যথা হতে পারে হাতেও। ছবি: সংগৃহীত
কখন এক মুহূর্তও দেরি করবেন না?
বুকে অস্বস্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট, ঘাম, চোয়াল বা হাতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সাহায্য নিন, যাতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়।
সময়ই সবচেয়ে বড় ওষুধ
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট অমূল্য। যত দ্রুত বন্ধ ধমনি খুলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা যায়, তত বেশি হৃদ্পেশি রক্ষা করা সম্ভব। এতে হার্ট ফেলিওরসহ ভবিষ্যতের জটিলতার ঝুঁকিও অনেকটাই কমে।
মনে রাখবেন, হার্ট অ্যাটাক সব সময় বুকব্যথা নিয়ে আসে না। কখনও শ্বাসকষ্ট, চোয়ালে ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমিভাব বা মাথা ঘোরাই হতে পারে শরীরের সতর্কবার্তা। তাই এমন কোনও উপসর্গকে হালকাভাবে নেবেন না। সময়মতো চিকিৎসাই পারে একটি জীবন বাঁচাতে।
