ফুটবল মাঠে তাঁর পায়ের জাদু দেখেছে গোটা বিশ্ব। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলিতে দিয়েগো মারাদোনার শরীর যে একাধিক বিপদের সংকেত দিচ্ছিল, তার সবকটি কি সময়মতো ধরা পড়েছিল? আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলারের মৃত্যুর তদন্তে আদালতে এক নেফ্রোলজিস্টের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর দাবি, মারাদোনার দীর্ঘদিনের কিডনির সমস্যা এবং শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়ার লক্ষণগুলি উপেক্ষিত হয়ে থাকতে পারে।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে মৃত্যু হয় মারাদোনার (Maradona)। তার কয়েক সপ্তাহ আগে মস্তিষ্কে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের বদলে বুয়েনস আইরেসের টাইগ্রেতে একটি ভাড়া বাড়িতে রেখে তাঁর শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ফুসফুসে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া, অর্থাৎ, পালমোনারি এডিমাতে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর আগে তাঁর কিডনি ঠিক কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল? মৃত্যুর এত বছর পর সেই প্রশ্নই এখন আদালতের শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দিয়েগো মারাদোনা। ছবি: সংগৃহীত
কিডনিতে কি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষতের চিহ্ন?
মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নেফ্রোলজিস্ট হার্নান ত্রিমার্কি দাবি করেছেন, মারাদোনার ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনির অসুখ ছিল। বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, মারাদোনার কিডনি স্বাভাবিকের তুলনায় বড় ছিল এবং সেখানে এমন কিছু ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল, যা দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাঁর ক্ষেত্রে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোকেন ব্যবহারের ইতিহাসও ছিল।
তবে কিডনির অসুখ থাকলেই যে সঙ্গে সঙ্গে কিডনি বিকল হয়ে যায়, এমন নয়। ক্রনিক কিডনি ডিজিজ ধীরে ধীরে এগোয় এবং অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। এই কারণেই একে অনেক সময় ‘নীরব অসুখ’ বলা হয়।
শরীরে জল জমছিল, কিন্তু ধরা পড়েনি!
কিডনি ঠিকমতো কাজ করতে না পারলে শরীর থেকে অতিরিক্ত জল ও নুন বের করে দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন শরীরের বিভিন্ন অংশে জল জমতে শুরু করে। পা, মুখ বা পেট ফুলে যেতে পারে, ওজন দ্রুত বাড়তে পারে এবং রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
অবস্থা গুরুতর হলে শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল ফুসফুসেও পৌঁছতে পারে। তখন শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং পালমোনারি এডিমার মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। হৃদ্যন্ত্র দুর্বল থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
আদালতে ত্রিমার্কি মারাদোনার শরীরের আকার বৃদ্ধি এবং রক্তচাপের কথাও উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুর আগে তাঁর পেটে উল্লেখযোগ্য ফোলাভাব দেখা গিয়েছিল বলে আদালতে দেখানো ছবিতে উঠে এসেছে। এই লক্ষণগুলির পিছনে কিডনির সমস্যা কতটা দায়ী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
পায়ের যাদু। ছবি: সংগৃহীত
‘প্রতিদিন পরীক্ষা করা উচিত ছিল’, দাবি বিশেষজ্ঞের
ত্রিমার্কির বক্তব্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের পর মারাদোনার মতো একজন জটিল রোগীর বাড়িতে থাকার সময় নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মতে, প্রতিদিন শারীরিক পরীক্ষা, নার্সিং কেয়ার, রক্ত পরীক্ষা এবং রক্তচাপ, হৃদ্স্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকগুলির নজরদারি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রায় দু'সপ্তাহের ওই সময়কালে রক্ত পরীক্ষার কোনও নথি পাওয়া যায়নি বলেও তিনি আদালতে জানান।
কিডনির অসুখ আর কিডনি ফেলিওর কি এক?
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ মানেই কিডনি ফেলিওর নয়। কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে পারে এবং রোগটি বিভিন্ন পর্যায়ে এগোয়। কিডনি কতটা কাজ করছে তা বোঝার জন্য চিকিৎসকেরা রক্তে ক্রিয়েটিনিন, eGFR, প্রস্রাবের পরীক্ষা এবং রক্তচাপের মতো একাধিক বিষয় দেখেন।
তাই শুধু কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেই বলা যায় না যে, একজন ব্যক্তি কিডনি ফেলিওরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তবে কিডনির কার্যক্ষমতা কমার সঙ্গে শরীরে জল-নুনের ভারসাম্য নষ্ট হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
'সাইলেন্ট কিলার'। তাই উপসর্গকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
আগে ধরা পড়লে কি বদলাতে পারত পরিস্থিতি?
মারাদোনার মৃত্যুর তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন, তাঁর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি না। হাসপাতালের বদলে বাড়িতে রেখে তাঁর চিকিৎসা করা কতটা নিরাপদ ছিল, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নার্সিং দলের সদস্য-সহ সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁরা অবশ্য তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মামলার শুনানি এখনও চলছে। আগামী দিনে আরও সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসতে পারে।
মারাদোনার ঘটনা অবশ্য শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের মৃত্যুর তদন্তের বিষয় নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, কিডনির অসুখ অনেক সময় শরীরে নিঃশব্দে থাবা বসায়। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা অন্যান্য ঝুঁকি থাকলে শরীর ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি, প্রস্রাবের পরিবর্তন বা রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
কারণ কিডনি যখন স্পষ্টভাবে জানান দিতে শুরু করে যে সমস্যা হয়েছে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই অসুখটি বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতে পারে।
