নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আকস্মিক জলস্রোতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত। ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, অনেকে এখনও নিখোঁজ। হিমালয়ের একটি হিমবাহের অংশ ধসে জল, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসার ফলেই এই বিপর্যয় বলে জানা গিয়েছে। চলছে উদ্ধারকাজ।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম লক্ষ্য অবশ্যই উদ্ধার ও ত্রাণ। কিন্তু জল কমে যাওয়ার পরেও শেষ হয় না বিপদ। বরং তখন সামনে আসে আর এক স্বাস্থ্যঝুঁকি, দূষিত জল ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা।
বন্যার জল রাস্তাঘাট, নিকাশি নালা, বাড়ি ও কৃষিজমির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় তাতে মিশে যেতে পারে মানুষের ও পশুর মলমূত্র, নোংরা জল, রাসায়নিক এবং বিভিন্ন জীবাণু। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পানীয় জল ও নিকাশি ব্যবস্থা। ফলে নিরাপদ জল ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে বাড়তে পারে নানা ধরনের সংক্রমণ।
জমা জলে সংক্রমণের বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
বন্যার জল থেকেই কেন সংক্রমণ?
প্লাবিত অঞ্চলে জলের সঙ্গে মিশে থাকা জীবাণু ও বর্জ্য শরীরে ঢুকলে পেটের সমস্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে। আবার জলের নিচে থাকা কাচ, লোহা বা ধারালো ধ্বংসাবশেষে পা কেটে গেলে সেই ক্ষতেও সংক্রমণ হতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ দূষিত জলের সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে শরীরে আগে থেকেই কাটা-ছেঁড়া থাকলে বিপদ বেশি।
কোন কোন রোগের আশঙ্কা থাকে?
দূষিত জল বা খাবার খেলে ডায়েরিয়া, বমি, পেটে ব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে। অপরিচ্ছন্নতা ও দূষিত খাবার-পানীয় জলের মাধ্যমে টাইফয়েডের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ছড়াতে পারে। দূষিত জল ও খাবার থেকে হেপাটাইটিস এ-ও হতে পারে।
বন্যার জলে বা ভেজা মাটিতে সংক্রমিত পশুর মূত্র মিশে থাকলে লেপ্টোস্পাইরোসিসের ঝুঁকি থাকে। অন্য দিকে, বন্যার সময় নোংরা বস্তুতে আঘাত লেগে ক্ষত তৈরি হলে টিটেনাসের আশঙ্কাও থাকে, বিশেষ করে টিটেনাসের টিকা আপডেট না থাকলে।
বিশেষ সাবধানতা প্রয়োজন। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে থাকবেন নিরাপদ?
যতটা সম্ভব বন্যার জল এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজন না হলে জলে হাঁটা বা গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকুন। জলের নিচে বিদ্যুতের তার, ধারালো বস্তু, নিকাশির বর্জ্য বা দুর্বল রাস্তা লুকিয়ে থাকতে পারে। একান্তই জলের সংস্পর্শে আসতে হলে জলরোধী জুতো ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করুন। শিশুদের বিশেষভাবে দূরে রাখুন।
পানীয় জলের ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি নেবেন না। বন্যার পরে কল, স্থানীয় জল সরবরাহের জল নিরাপদ ধরে নেবেন না। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে বোতলজাত, ফুটিয়ে নেওয়া বা যথাযথভাবে পরিশোধিত জল ব্যবহার করুন। শুধু পান করার জন্য নয়, রান্না, দাঁত মাজা এবং শিশুর খাবার তৈরির ক্ষেত্রেও নিরাপদ জল ব্যবহার জরুরি।
বন্যার জলে ভিজে যাওয়া বা দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকা খাবার খাবেন না। কারণ রান্না করা খাবারেও জীবাণু বা রাসায়নিক দূষণ থাকতে পারে।
কাটা-ছেঁড়া হলে অবহেলা করবেন না। পরিষ্কার জল ও সাবান দিয়ে ক্ষত ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে ড্রেসিং করে ঢেকে রাখুন। ক্ষত লাল হয়ে গেলে, ফুলে গেলে, ব্যথা বাড়লে বা পুঁজ বের হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গভীর বা নোংরা ক্ষত হলে টিটেনাসের টিকা প্রয়োজন কি না, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
হাতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। বন্যার জলের সংস্পর্শে আসার পরে, খাবার তৈরি বা খাওয়ার আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পরে সাবান জলে হাত ধুয়ে নিন। সাবান ও জল না থাকলে এবং হাত দৃশ্যত নোংরা না হলে অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
জম কমলে আসে আরেক বিপদ! ছবি: সংগৃহীত
জ্বর, ডায়রিয়া হলে সতর্ক
বন্যার পরে ডায়েরিয়া, বমি, জ্বর, তীব্র পেটে ব্যথা, ত্বকে সংক্রমণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য কোনও নতুন উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি হালকা ভাবে নেবেন না। বিশেষ করে দূষিত জল বা বন্যার জলের সংস্পর্শের পরে এমন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বন্যার জল সরে গেলেই বিপদ শেষ নয়। নিরাপদ জল, পরিচ্ছন্ন খাবার, হাত ধোয়া এবং ক্ষতস্থানের সঠিক যত্ন, এই কয়েকটি অভ্যাসই বন্যা-পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
