পরিচালক কবীর খানের ছবির একটি অ্যাকশন দৃশ্য শুটিংয়ের সময় হাঁটুতে চোট পান অভিনেতা কার্তিক আরিয়ান (Kartik Aaryan)। তাঁকে মুম্বইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সফল অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে বাড়িতেই রয়েছেন অভিনেতা। সোশাল মিডিয়ায় নিজের চোটের ছবি পোস্ট করে মজার ছলেই লিখেছেন, ‘Foot out of service’।
হাঁটুর চোট মানেই যে ছোটখাটো সমস্যা, তা নয়। হাঁটুর ভিতরে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লিগামেন্ট, মেনিস্কাস, তরুণাস্থি, টেন্ডন এবং হাড়। এর যে কোনও একটি অংশে গুরুতর আঘাত লাগলে হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়া ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে।
কার্তিক আরিয়ান। ছবি: সংগৃহীত
হাঁটুতে চোট কতটা গুরুতর?
হাঁটু শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থল। হাঁটা, দৌড়নো, সিঁড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে লাফানো বা হঠাৎ দিক পরিবর্তন— প্রায় প্রতিটি কাজেই হাঁটুর উপর চাপ পড়ে। খেলাধুলা বা অ্যাকশন দৃশ্যের সময় হঠাৎ পা ঘুরে যাওয়া, দিক পরিবর্তন বা সরাসরি আঘাতের ফলে অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএল-এ চোট লাগতে পারে। এই লিগামেন্ট হাঁটুর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
আবার হাঁটুর ভিতরের মেনিস্কাসে চোট লাগলে ব্যথা, ফোলা এবং হাঁটু ভাঁজ বা সোজা করতে সমস্যা হতে পারে। কখনও লিগামেন্টের সঙ্গে মেনিস্কাস বা তরুণাস্থিতেও একসঙ্গে চোট লাগে। তখন হাঁটুর সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে হাঁটুতে চোট লাগলেই সবসময় অস্ত্রোপচার করতে হয় না। চোটের ধরন ও মাত্রা, হাঁটুর স্থিতিশীলতা, রোগীর বয়স, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং শারীরিক সক্রিয়তার মাত্রা দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন অস্ত্রোপচার প্রয়োজন কি না।
কখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে?
লিগামেন্টে গুরুতর চোট বা ছিঁড়ে যাওয়া, হাঁটুতে এমন সমস্যা, যা দৈনন্দিন কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, এছাড়া নির্দিষ্ট ধরনের মেনিস্কাসের চোট বা তরুণাস্থির ক্ষতির ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ, বিশ্রাম এবং ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
চোটের প্রকৃতি বোঝার জন্য প্রথমে শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে এমআরআই করে হাঁটুর ভিতরের লিগামেন্ট, মেনিস্কাস ও অন্যান্য নরম টিস্যুর ক্ষতি কতটা হয়েছে তা দেখা হয়।
হাঁটুর আঘাতকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
কতদিনে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়?
এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ হাঁটুর সব অস্ত্রোপচার এক রকম নয়। ছোটখাটো কিছু প্রক্রিয়ার পর তুলনামূলক দ্রুত দৈনন্দিন কাজে ফেরা সম্ভব হলেও গুরুতর লিগামেন্টের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এসিএল অস্ত্রোপচারের পর খেলাধুলা বা অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজে ফিরতে অনেক সময় ৯-১২ মাস পর্যন্তও লাগতে পারে।
তবে সময়ের হিসাব ব্যক্তি ও অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী বদলায়। শুধু অস্ত্রোপচার সফল হলেই চিকিৎসা শেষ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় তার পরের রিহ্যাবিলিটেশন পর্বে।
ফিজিওথেরাপি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অস্ত্রোপচারের পর প্রথম লক্ষ্য থাকে ব্যথা ও ফোলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধীরে ধীরে হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা। প্রয়োজন হলে কিছুদিন ক্রাচ বা হাঁটুর ব্রেস ব্যবহার করতে হতে পারে।
এরপর শুরু হয় পেশির শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন। ধীরে ধীরে হাঁটুর নড়াচড়া, ভারসাম্য, শরীরের সমন্বয় এবং হাঁটুর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াই নির্ভর করে চোটের ধরন ও অস্ত্রোপচারের উপর।
ফিরুক দ্রুত সুস্থতা। ছবি: সংগৃহীত
হাঁটতে পারলেই কি শুটিংয়ে ফেরা যায়?
একেবারেই নয়। বিশেষ করে অভিনেতা বা ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারা আর দৌড়ানো, লাফানো, নাচ, মারপিটের দৃশ্য বা দীর্ঘক্ষণ কঠিন শারীরিক কাজ করার মতো অবস্থায় পৌঁছনো এক বিষয় নয়।
চোট পুরোপুরি সেরে ওঠার আগেই অতিরিক্ত চাপ দিলে ফের হাঁটুতে আঘাত লাগতে পারে। বিশেষ করে লিগামেন্টের অস্ত্রোপচারের পর খুব দ্রুত খেলাধুলা বা কঠিন শারীরিক কাজে ফিরলে পুনরায় চোটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অস্ত্রোপচারের পর কোন লক্ষণে সতর্কতা জরুরি?
অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা বা ফোলা ক্রমশ বাড়তে থাকলে, হাঁটুর আশপাশ লাল হয়ে গেলে, জ্বর এলে বা অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থান থেকে অস্বাভাবিক তরল বের হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
আর এর সঙ্গে যদি বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হয়, তা জরুরি পরিস্থিতির লক্ষণ হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর বিরল ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বেঁধে তা ফুসফুসে পৌঁছতে পারে।
কার্তিক আরিয়ানের হাঁটুর চোট তাই মনে করিয়ে দেয়, শরীরকে চ্যালেঞ্জ জানানো পেশায় থাকলেও চোটের পর দ্রুত কাজে ফেরাই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। হাঁটুকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সময় দেওয়া, পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা, সুস্থ জীবনে ফেরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
