রাতে এক কাপ কফি অনেকের কাছেই কাজের সঙ্গী। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এই অভ্যেস শুধু ঘুমের ক্ষতি করে না, আমাদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনও বদলে দিতে পারে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে।
এতদিন পর্যন্ত রাতে কফি পানের প্রধান সমস্যা (Side Effects of Coffee) হিসেবে ধরা হত অনিদ্রা, অস্থিরতা আর পরের দিনের ক্লান্তি। কারণ ক্যাফেইন মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের ঘুম-সৃষ্টিকারী রাসায়নিককে বাধা দেয়। ফলে শরীর জেগে থাকে, কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। তবে এখন গবেষকরা দেখছেন, বিষয়টি এর চেয়েও গভীর।
ছবি: সংগৃহীত
বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, মানুষ হঠাৎ করে বেশি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই প্রবণতা নারীদের ক্ষেত্রে আরও বেশি দেখা গেছে।
গবেষণাটি করা হয় ড্রসোফিলা মেলানোজেস্টার (একধরনের ফলের মাছি) উপর, যা স্নায়বিক আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি মডেল। সেখানে দেখা যায়, রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ করা ড্রসোফিলা মেলানোজেস্টাররা নেতিবাচক উদ্দীপনায় নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে কম সক্ষম। সহজভাবে বললে, তারা বেশি ‘ইমপালসিভ’ হয়ে ওঠে। কিন্তু দিনের বেলায় একই মাত্রার ক্যাফেইন এই প্রভাব তৈরি করেনি। অর্থাৎ, কখন কফি পান করছেন, সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: সংগৃহীত
নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি হওয়ার পেছনে হরমোন, বিপাকক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের রাসায়নিক পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাই একই অভ্যেস সবার ক্ষেত্রে একরকম প্রভাব ফেলে না।
ক্যাফেইন মূলত অ্যাডেনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করে আমাদের জাগিয়ে রাখে এবং ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার সক্রিয় করে। এতে মনোযোগ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু রাতে এই অতিরিক্ত উদ্দীপনা মস্তিষ্কের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মসংযম দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ঘুমনোর কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন নিলে ঘুমের মান কমে যায়। আর তার প্রভাব পড়ে পরের দিনের চিন্তাভাবনা ও আচরণে।
ছবি: সংগৃহীত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই গবেষণা শুধু ঘুম নয়, আচরণগত প্রভাবের দিকেও আলোকপাত করছে। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ অনেক সময় বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। রাতে কফি পানের ফলে যদি মস্তিষ্কে কোনও কিছু ভাবার ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে তার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে রাত জাগা প্রায় স্বাভাবিক। অনেকেই কাজ বা পড়াশোনার জন্য কফির উপর নির্ভর করেন। কিন্তু এই অভ্যেস দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের সঙ্গে আচরণগত সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
তবে কফি পান বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। দিনের মধ্যে সীমিত রাখলে কফি আমাদের কাজে সাহায্য করতে পারে, আর রাতের দিকে এড়িয়ে চললে ঘুম, মন আর আচরণ- সবেই থাকবে ভারসাম্যে।
