দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, মাঠে চোট- কয়েক বছর ধরে একের পর এক শারীরিক ধকলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় তারকা উইকেটকিপার-ব্যাটার ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant)। ২০২২-এ গাড়ি দুর্ঘটনার পর ক্রিকেটজীবনে তৈরি হয়েছিল সংশয়। দীর্ঘ রিহ্যাবের পর মাঠে ফেরা। আবার ইংল্য়ান্ড সিরিজে ভাঙে গোড়ালি। সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরে নিউজিল্য়ান্ড সিরিজের আগে চোট পেয়ে আবার মাঠের বাইরে। আইপিএলের আগে নিজেকে পুরো ফিট করতে তিনি এবার বেছে নিলেন হাইপারব্যারিক অক্সিজেন থেরাপি (HBOT)।
ছবি: সংগৃহীত
হাইপারব্যারিক অক্সিজেন থেরাপি কী?
হাইপারব্যারিক অক্সিজেন থেরাপি একটি বিশেষধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে রোগীকে একটি বদ্ধ চেম্বারের ভেতর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বায়ুচাপে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেনে শ্বাস নিতে হয়। সাধারণ অবস্থায় অক্সিজেন মূলত লোহিত রক্তকণিকার মাধ্যমে শরীরে পৌঁছায়। কিন্তু যখন চাপ বাড়ানো হয়, তখন অক্সিজেন সরাসরি রক্তের প্লাজমায় বেশি পরিমাণে মিশে যায়। ফলে শরীরের সেই সব অংশেও অক্সিজেন পৌঁছায়, যেখানে রক্তপ্রবাহ কম বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত।
অতিরিক্ত অক্সিজেনের সুফল—
- নতুন রক্তনালী তৈরি করতে সাহায্য করে
- ফোলা ও প্রদাহ কমায়
- কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়
- সাহায্য় করে দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে
- সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে করে সহায়তা
- সহজ ভাষায়, এটি শরীরের স্বাভাবিক রোগ নিরাময় প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে
ছবি: সংগৃহীত
কারা এই থেরাপির জন্য উপযুক্ত?
এটি কোনও ‘ফিটনেস ট্রেন্ড’ নয়। নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা পরিস্থিতিতে এর প্রমাণিত ব্যবহার রয়েছে। যেমন—
- দীর্ঘদিনের না-সারা ক্ষত, বিশেষ করে ডায়াবেটিক ফুট আলসার
- রেডিয়েশনজনিত টিস্যুর ক্ষতি
- গুরুতর সংক্রমণ
- কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া
- ডিকম্প্রেশন সিকনেস
স্পোর্টস মেডিসিনে এটি সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, বিশেষ করে যখন চোট সারতে দেরি হয় বা টিস্যুতে অক্সিজেনের ঘাটতি থাকে। তবে চিকিৎসকদের কথায়, উচ্চচাপে অক্সিজেন সঠিক মাত্রা ও সময় না মানলে উপকারের বদলে ক্ষতিও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ছবি: সংগৃহীত
খেলাধুলোর চোটে কতটা কার্যকর?
- দেরিতে সারা সফট টিস্যু ইনজুরি
- অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা
- টিস্যুতে অক্সিজেনের ঘাটতি
- তবে সাধারণ পেশির ক্লান্তি, পারফরম্যান্স বাড়ানো বা দ্রুত রিকভারি- এসব ক্ষেত্রে এখনও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এগুলো এখনও গবেষণাধীন।
হাইপারব্যারিক অক্সিজেন থেরাপি কীভাবে দেওয়া হয়?
একটি সেশন সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ মিনিটের। স্পোর্টস ইনজুরিতে সাধারণত টানা ১০ দিনে প্রায় ১০টি সেশন দেওয়া হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে ১৫–২০টি বা তার বেশি সেশন লাগতে পারে। সমাজমাধ্য়মে সম্প্রতি এক ভিডিওতে দেখা গেছে, পন্থকে (Rishabh Pant) গোলাকার একটি যন্ত্রে প্রবেশ করে সেখানে বসে থাকতে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। বদ্ধ চেম্বারের মতো ওই যন্ত্রের সাহায্যেই শরীরে বাড়ানো হয় অক্সিজেনের মাত্রা।
থেরাপির সময় যে দিকগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়
নির্দিষ্ট বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ
অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা
নিয়মিত চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ
ছবি: সংগৃহীত
কত দ্রুত ফল মেলে?
এটি কোনও ম্যাজিক থেরাপি নয়। বরং শরীরের স্বাভাবিক রোগ নিরাময় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েকটি সেশনের পর ফোলা বা প্রদাহ থেকে মেলে স্বস্তি। ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে মিলিয়ে ১–২ সপ্তাহের মধ্যে আশাব্য়ঞ্জক ফল মিলতে শুরু করে। তবে এই ফল নির্ভর করে—
চোটের ধরন
চোটের তীব্রতা
রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা
রোগী কীভাবে রিহ্যাব প্রোটোকল মানছেন তার উপর
খরচ
প্রায় ১০ দিনের চিকিৎসায় আনুমানিক খরচ ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো। সেশন বাড়লে খরচও বাড়ে।
নিরাপত্তাজনিত দিক
সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করলে HBOT নিরাপদ। তবে ভুলভাবে প্রয়োগ হলে অক্সিজেন টক্সিসিটি, কান বা সাইনাসে চাপজনিত সমস্যা হতে পারে। তাই স্বীকৃত ও পরিকাঠামো-সমৃদ্ধ কেন্দ্রেই এই চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
মনে রাখুন
ঋষভ পন্থের মতো পেশাদার ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও বৈজ্ঞানিকভাবে পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি সেই প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে, যদি তা সঠিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এটি সবার জন্য নয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।
