রক্তচাপ বাড়লেই ওষুধ নয়, আগে এক গ্লাস গরম জল! সমাজমাধ্যমে এমন পরামর্শের ছড়াছড়ি। দাবি, নিয়মিত গরম জল পানেই নাকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় রক্তচাপ। কিন্তু সত্যিই কি এত সহজে কমে রক্তচাপ? হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরম জল পানে শরীরে সাময়িক কিছু পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু তাকে হাইপারটেনশনের চিকিৎসা ভাবা বড় ভুল।
গরম জল পানে শরীরে কী হয়?
চিকিৎসকদের মতে, গরম জল পান করলে শরীর কিছুটা শিথিল হয়। উষ্ণতার প্রভাবে রক্তনালিগুলি সামান্য প্রসারিত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ভ্যাসোডাইলেশন’। এর ফলে রক্তনালির প্রতিরোধ কিছুটা কমে গিয়ে রক্তচাপও অল্প সময়ের জন্য কমতে পারে।
পর্যাপ্ত জল পান কিডনির স্বাভাবিক কাজ এবং রক্তসঞ্চালন ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেই রয়েছে আসল কথা। এই প্রভাব সাময়িক। গরম জল উচ্চ রক্তচাপ কমায় না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়। ছবি: সংগৃহীত
রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করে গরম জল? বিপদ সেখানেই
উচ্চ রক্তচাপ কোনও একক কারণে হয় না। ধমনির শক্ত হয়ে যাওয়া, কিডনির হরমোন নিয়ন্ত্রণ, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ, বংশগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, বেশি নুন খাওয়া এবং শরীরচর্চার অভাব, একাধিক কারণ এর নেপথ্যে থাকতে পারে।
এক গ্লাস গরম জল খেয়ে এই সমস্যাগুলির কোনওটিই দূর করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ করে শুধু গরম জলের উপর নির্ভর করলে উলটে বিপদ বাড়তে পারে। চিকিৎসা দেরি হলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনির অসুখের ঝুঁকিও বাড়ে।
তা হলে গরম জলে স্নান করলে?
এখানে অবশ্য কিছুটা আলাদা ছবি দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত ভাবে শরীরকে তাপের সংস্পর্শে রাখলে রক্তনালিগুলি প্রসারিত হয়। ফলে রক্ত চলাচল সহজ হতে পারে এবং ধমনির ভিতরের চাপ সাময়িক ভাবে কমতে পারে।
২০২১ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা এবং প্রায় ১৫টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাপ-চিকিৎসায় সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে প্রায় ৪ mmHg করে কমতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০-৪০ মিনিট গরম জলে শরীর ডুবিয়ে রাখার পর উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ২৪ ঘণ্টার গড় সিস্টোলিক রক্তচাপ প্রায় ৬-৭ mmHg পর্যন্ত কমেছে।
তবে গরম জলে শরীর ডুবিয়ে রাখার এই গবেষণার ফলকে গরম জল পানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। গরম জল খেলেই একই ফল পাওয়া যায়, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও নেই।
দরকার নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রেশার মাপা। ছবি: সংগৃহীত
গরম জলে স্নানেও সাবধান
অতিরিক্ত তাপে রক্তচাপ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নেমে যেতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্রোগী, লো প্রেশারের রোগী, বার বার মাথা ঘোরে এমন ব্যক্তি এবং রক্তনালি প্রসারিত করে এমন ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম জলের ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই হট-ওয়াটার থেরাপিকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ছবি: সংগৃহীত
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরীক্ষিত বা প্রমাণিত উপায়গুলির উপরই ভরসা রাখুন। নুন কম খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফল-সবজি ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, ধূমপান ও মদ্যপান এড়ানো এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। চিকিৎসক ওষুধ দিলে সেটিও নিয়মিত খেতে হবে। গরম জল শরীরকে আরাম দিতে পারে, কিন্তু তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ নয়।
