রাতে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, সকালে ক্লান্তি নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা, এসবকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অথচ এর নেপথ্যে থাকতে পারে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ), যা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়।
এই রোগের চিকিৎসায় এতদিন সিপ্যাপ ছিল সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তবে যাঁরা এই যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন না বা নিয়মিত ব্যবহার করতে অসুবিধায় পড়েন, তাঁদের জন্য নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে 'জিভের পেসমেকার' নামে পরিচিত হাইপোগ্লোসাল নার্ভ স্টিমুলেশন (এইচজিএনএস)।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি শুধু ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে না, বরং উচ্চ রক্তচাপ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় বাড়ে একাধিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
যখন ঘুমই ডেকে আনে বিপদ
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের সময় গলার পেশি অতিরিক্ত শিথিল হয়ে শ্বাসনালির পথ বারবার বন্ধ করে দেয়। ফলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে এবং মস্তিষ্ক বারবার ঘুম ভাঙিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়া রাতভর বহুবার ঘটতে পারে।
এর ফলে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব, মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তির সমস্যা এবং সকালে মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসা না হলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
কী এই ‘জিভের পেসমেকার’?
নামের সঙ্গে 'পেসমেকার' শব্দটি থাকলেও এটি হৃদ্যন্ত্রের পেসমেকার নয়। এটি এমন একটি ক্ষুদ্র ইমপ্লান্ট, যা জিভের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী হাইপোগ্লোসাল নার্ভকে উদ্দীপিত করে। একটি ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নার্ভটির চারপাশে একটি ইলেকট্রোড বসানো হয়। সেটি বুকের উপরের অংশে ত্বকের নিচে স্থাপন করা একটি ছোট যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
ঘুমের সময় রোগী যখন শ্বাস নেন, তখন যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালকা বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায়। এতে জিভ সামান্য সামনে সরে আসে এবং শ্বাসনালির পথ খোলা থাকে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয় না। সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে সিপ্যাপের মতো মুখে মাস্ক পরে ঘুমানোর প্রয়োজন হয় না।
গবেষণায় কী জানা গেল?
ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো মেডিসিনের গবেষকেরা প্রায় ৩,৪০০ জন এইচজিএনএস ইমপ্লান্ট নেওয়া রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয় একই ধরনের আরও প্রায় ৩,৪০০ জন স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগীর, যাঁরা সিপ্যাপ নিয়মিত ব্যবহার করতে না পারায় এই চিকিৎসা পাননি।
দু-বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এইচজিএনএস ব্যবহারকারীদের মধ্যে-
- টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অন্তত ৮১ শতাংশ কমেছে
- উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি ৫১ শতাংশ কমেছে
গবেষকদের মতে, সিপ্যাপ কার্যকর হলেও অনেক রোগী অস্বস্তি, শব্দ বা মাস্ক পরে ঘুমানোর অসুবিধার কারণে নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে চিকিৎসার সুফলও কমে যায়। এমন রোগীদের জন্য এইচজিএনএস একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
পেসমেকার কি হবে সিপ্যাপের বিকল্প? ছবি: সংগৃহীত
সিপ্যাপের বিকল্প, তবে সবার জন্য নয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মাঝারি থেকে গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় সিপ্যাপ এখনও প্রথম পছন্দের চিকিৎসা। কারণ নিয়মিত ব্যবহার করলে এটি অত্যন্ত কার্যকর। তবে যাঁরা সিপ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে এইচজিএনএস হতে পারে একটি আরামদায়ক ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প। তবে এই চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়। রোগীর শ্বাসনালির গঠন, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয় মূল্যায়ন করে ঘুম বিশেষজ্ঞ বা ইএনটি বিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেন, কে এই ইমপ্লান্টের জন্য উপযুক্ত।
গবেষণা আশাব্যঞ্জক, তবে এখনও পথ বাকি
গবেষণার ফল নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও এটি মাত্র দু-বছরের তথ্যের উপর ভিত্তি করে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই প্রযুক্তি হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হার্ট ফেলিওর বা অন্যান্য হৃদরোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি কতটা কমাতে পারে, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।
যাঁরা সিপ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন না, তাঁদের জন্য ‘জিভের পেসমেকার’ ভবিষ্যতে স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ভালো ঘুমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
