এক পশলা বৃষ্টি যেমন গরমের ক্লান্তি দূর করে, তেমনই নিঃশব্দে শরীরে ডেকে আনতে পারে কিছু অস্বস্তিও। তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শরীরচর্চা কমে যাওয়া, এমনকী বর্ষার সংক্রমণও প্রভাব ফেলতে পারে রক্তচাপের উপর। তাই বর্ষাকাল শুধু ডেঙ্গু বা ভাইরাল জ্বরের সময়ই নয়, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্যও এটি বাড়তি সতর্কতার মরশুম।
অনেকের ধারণা, রক্তচাপের সমস্যা কেবল শীতেই বাড়ে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বর্ষাতেও নানা কারণে রক্তচাপ ওঠানামা করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা কিডনির অসুখ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কখনও কখনও গুরুতর জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আবহাওয়ার বদল, রক্তচাপেরও বদল
আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরও নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বর্ষায় তাপমাত্রা কমে গেলে অনেকের রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে। এই পরিবর্তনের ফলে রক্তচাপ কখনও বেড়ে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে কমেও যেতে পারে।
টানা বৃষ্টির কারণে হাঁটাচলা বা শরীরচর্চা কমে যায়। সেই সঙ্গে ভাজাভুজি, নোনতা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অতিরিক্ত নুন শরীরে জল জমিয়ে রাখে, ফলে রক্তের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে রক্তচাপও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আবার অনেকেই বর্ষায় কম জল পান করেন। ফলে কোনও কারণে জলশূন্যতা দেখা দিলে রক্তসঞ্চালনে প্রভাব ফেলে রক্তচাপের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। ছবি: সংগৃহীত
মরশুমি সংক্রমণও হতে পারে নেপথ্যের কারণ
বর্ষাকালে ভাইরাল জ্বর, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ফ্লু বা ডায়রিয়ার মতো সংক্রমণের প্রকোপ বেড়ে যায়। এসব রোগে জ্বর, বমি বা পাতলা পায়খানার কারণে শরীর থেকে প্রচুর জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে।
আবার কিছু সংক্রমণের সময় শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যাতে রক্তচাপ বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘদিন জ্বর, বমি, ডায়রিয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
- যাঁদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে
- প্রবীণ ব্যক্তি
- ডায়াবেটিস আক্রান্ত
- ক্রনিক কিডনি ডিজিজে ভোগা রোগী
- হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে
- উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় আক্রান্ত গর্ভবতী নারী
- যাঁরা নিয়মিত একাধিক রক্তচাপের ওষুধ বা ডাইইউরেটিক ওষুধ খান
এই ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না
উচ্চ রক্তচাপকে 'নীরব ঘাতক' বলা হলেও রক্তচাপের বড় ধরনের ওঠানামায় কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে। যেমন-
- তীব্র মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা
- ঝাপসা দেখা
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- বুক ধড়ফড় করা
- পা ফুলে যাওয়া
- শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া
- বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ
এগুলোর যেকোনও একটি দেখা দিলেও দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লক্ষণকে অবেহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
বর্ষায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন কীভাবে?
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খান
- নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন করবেন না
- নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন
- পর্যাপ্ত জল পান করুন, কিডনি বা শরীরে কোনও ক্রনিক অসুখ থাকলে জল পানে বিধিনিষেধ থাকতে পারে
- খাবারে নুন কমান, ভাজাপোড়া, আচার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
- বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে ঘরেই হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
মনে রাখুন
বর্ষাকাল নিজে থেকে উচ্চ রক্তচাপ তৈরি করে না। তবে এই মরশুমে পরিবেশগত পরিবর্তন, জীবনযাত্রার বদল এবং সংক্রমণের ঝুঁকি মিলেই রক্তচাপকে অস্থির করে তুলতে পারে। তাই এই সময়ে একটু বেশি সচেতনতা, নিয়মিত ওষুধ সেবন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জল পান এবং রক্তচাপ পর্যবেক্ষণের অভ্যাসই আপনাকে বড় বিপদ থেকে দূরে রাখতে পারে।
