বই পড়া অনেক সময়ই নিছক ব্যক্তিগত আনন্দ- একটু নির্জনতা, একটু কল্পনা, একটু নিজের সঙ্গে থাকা। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই সহজ অভ্যাসই হয়তো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির একটি।
কল্পনার চরিত্রদের কথা ভাবুন। ওয়াল্টার হোয়াইট রসায়ন মুখস্থ করতেন, ছিল তার তীক্ষ্ণ স্মৃতি। হারমায়োনি গ্রেঞ্জার প্রায় সবকিছুই মনে রাখতে পারত, আর ররি গিলমোর যেন প্রতিদিন একের পর এক বই শেষ করত। এতদিন এগুলোকে আমরা কল্পনার মজার বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখেছি।
কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, এই 'বুকওয়ার্ম'দের অভ্যাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে বাস্তব উপকার। গবেষণা বলছে, নিয়মিত বই পড়লে ভালো থাকে স্মৃতিশক্তি-সহ মস্তিষ্কের অন্যান্য কার্যকলাপ।
ছবি: সংগৃহীত
তাই আজ ২৩ এপ্রিল ২০২৬, বিশ্ব বই দিবস (World Book Day), শুধু সাহিত্য উদযাপনের দিন নয়, বরং নিজের মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেয়। কারণ বই পড়া শুধু সময় কাটানো নয়, এটি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতেও বড় ভূমিকা নিতে পারে।
ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের বিপদ
ডিমেনশিয়ার চিত্রটা বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৫.৫ কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হতে পারে। এটি এমন এক অবস্থা, যা ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি, চিন্তাভাবনা এবং পরিচয়কে মুছে দেয়, যা ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবারের জন্যও এক গভীর আঘাত।
এর চিকিৎসা এখনও সীমিত, তাই গবেষকরা এখন বেশি জোর দিচ্ছেন এমন অভ্যাসের উপর, যা এই ঝুঁকি কমাতে পারে। আর সেই তালিকায় বই পড়া অন্যতম।
ছোট থেকেই গড়ে উঠুক বই পড়ার অভ্যাস। ছবি: সংগৃহীত
কগনিটিভ রিজার্ভ: মস্তিষ্কের গোপন শক্তি
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বই পড়েন বা মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের মস্তিষ্ক বয়সের প্রভাব ভালোভাবেই সামল নিতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হ্রাসের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সারা জীবন পড়ার অভ্যাস বজায় রাখেন, তাদের ৮০ বছর বয়সে কগনিটিভ ডিক্লাইন প্রায় ৩২% কম হয় অন্যদের তুলনায়। এর পেছনে কাজ করে ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’, অর্থাৎ, মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতা, যা মস্তিষ্কের ক্ষতি হলেও কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত পড়াশোনা এই কগনিটিভ রিজার্ভ তৈরি করে, ঠিক যেমন নিয়মিত ব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখে।
পড়ার সময় মস্তিষ্কে কী হয়?
একটি গল্প পড়ার সময় মস্তিষ্ক শুধু শব্দ পড়ে না, সে নিজের মতো করে একেকটা জগৎ তৈরি করে। চরিত্রগুলোকে কল্পনা করে, তাদের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করে, গল্পের ভেতর সূত্র খোঁজে এবং পরের ঘটনা অনুমান করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের একটি সক্রিয় অনুশীলন, যা ধীরে ধীরে তাকে আরও দক্ষ করে তোলে।
ছবি: সংগৃহীত
স্ক্রিন বনাম বই
টিভি বা ভিডিও দেখা নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক, কিন্তু মস্তিষ্কের কাজ সেখানে অনেকটাই কম। ছবি, শব্দ, গতি- সবই তৈরি অবস্থায় আমাদের সামনে আসে। আমাদের কল্পনার জায়গাটা সেখানে খুব কম কাজ করে। অন্যদিকে, বই পড়ার সময় মস্তিষ্ককে নিজেই সবকিছু তৈরি করতে হয়। তাই এটি অনেক বেশি সক্রিয় অভিজ্ঞতা।
শুরুর সেরা সময়
কোনও ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য কখনওই দেরি করা উচিত নয়। ছোটবেলা থেকে পড়ার অভ্যাস থাকলে তার প্রভাব সবচেয়ে গভীর হয়। শিশুদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করানো শুধু তাদের জ্ঞান বাড়ায় না, ভবিষ্যতের জন্য তাদের মস্তিষ্ককেও রাখে সুস্থ-সবল।
মনে রাখুন
যে বইটি পড়ছেন সেটি ক্লাসিক না থ্রিলার, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল আপনি নিয়মিত পড়ছেন কি না। আজ বিশ্ব বই দিবসে একটা সহজ সিদ্ধান্ত নিন, প্রতিদিন একটু সময় বইয়ের জন্য রাখুন। হয়তো সেই কয়েকটা পৃষ্ঠাই একদিন আপনার স্মৃতিকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।
