ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৬টা ৩৫। চারপাশে পদ্ম পতাকা আর গেরুয়া প্রার্থী নদিয়ার চাঁদ বাউরির ব্যানার। কাঁচা রাস্তায় পথচলতি মানুষ। পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে রুকনি রেললাইন। কিন্তু কথা নেই কারও মুখে। লক্ষ্মীবারে বাড়ির বাইরে মৃত বাবা দুর্জন মাঝির মূর্তি জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করছেন একমাত্র ছেলে কানাই। কখন দিতে যাবেন ভোট? বেশ কিছুক্ষণ পর উত্তর আসে, ‘‘বড়মাকে নিয়ে যাবো একটু পরে।" মূর্তি ধোয়া হতেই হাতে বালতি নিয়ে বারমুডা থেকে মোবাইল বার করে কথা বলতে বলতে বাড়ির ভিতরে চলে যান। ততক্ষণে লাঠি হাতে বেরিয়ে এসেছেন বড়মা। বললেন, ‘‘ওই শুনানির কাগজটার জন্যই জীবনটা চলে গেল। আতঙ্কে রেললাইনে জীবনটা শেষ করে দিল। আর কোনওদিন ঘুরবেক নাই।" কানাইয়ের দ্বিতীয় মা অবশ্য জানালেন, তিনি এবং তাঁর বউমা ভোটের মেশিনে বোতাম টিপে বদলা নিয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। রাজ্যে এসআইআরের পর ভোটের খসড়া তালিকায় নাম না থাকায় পুরুলিয়ার পাড়া ব্লকে ওই দিন দুপুর দেড়টায় শুনানিতে তলব করেছিল নির্বাচন কমিশন। গত ২৫ ডিসেম্বর শুনানির ওই নোটিস পাওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন আদিবাসী জনজাতির ৮২ বছরের বৃদ্ধ দুর্জন মাঝি। নিজের মধ্যে সেই প্রশ্নে মানসিক যুদ্ধ চলছিল তাঁর। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকার পরেও আদিবাসী জনজাতির বৃদ্ধ হয়ে কেন এমন হবে, এর উত্তর মিলছিল না। তাই ৮ কিমি দূরে ওই দিন পাড়া ব্লকে শুনানিতে যেতে সকাল ৮ টাতেই বাড়িতে বলে গিয়েছিলেন টোটো ডাকতে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর জানা গেল, বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে আনাড়া-রুকনি শাখা রেলপথে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে তার দেহ। মৃত্যুর কারণ বুঝতে অসুবিধা হয়নি পরিবার-সহ এলাকার মানুষজনের। ওই রাতেই দুর্জন মাঝির ছেলে কানাই মাঝি সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নামে থানায় অভিযোগ করেন। বাবার আত্মহত্যার জন্য কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও রাজ্যের নির্বাচন কর্তা মনোজকুমার আগরওয়ালের নামে অভিযোগ করেন। যদিও পাড়া থানায় মামলা রুজু হয় প্রায় ১ মাস পর।
মৃত বাবার মূর্তি ধুইয়ে দিচ্ছেন ছেলে কানাই মাঝি। বৃহস্পতিবার সকালে পুরুলিয়ার আনাড়ার চৌতলা গ্রামে। নিজস্ব ছবি
নির্বাচন কমিশনের গাফিলতির কারণে আদিবাসী জনজাতির বৃদ্ধের প্রাণ যাওয়ার অভিযোগ তুলে ছেলে কানাই মাঝিকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যু হওয়ার কারণে রাজ্যজুড়ে যারা স্পেশাল হোমগার্ডের চাকরি পেয়েছেন সেই তালিকায় রয়েছেন ২৭ বছরের এই কানাই মাঝি। পুরুলিয়া বেলগুমা পুলিশ লাইনে এখন তাঁর প্রশিক্ষণ চলছে। গ্রামের বুথে ভোট দেবেন বলে বুধবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন কানাই। তাঁর কথায়, ‘‘যাদের জন্য বাবার মৃত্যু হয়েছিল তাদেরকে জবাব দিতেই আমার প্রতিবাদের ভোট, প্রতিশোধের ভোট।"
তাই সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ বড়মা সীতামণি মাঝিকে নিয়ে প্রায় ১ কিমি দূরে হেঁটে পাড়া বিধানসভার পাড়া ব্লকের আনাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ফুলুরডি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রওনা হন। ভোট (Bengal Election 2026) দিয়ে কানাই বলেন, "বাবার মৃত্যুর জবাবটা যেন দিতে পারলাম। তাই সকালে বাবার মূর্তি জল দিয়ে ধুইয়ে প্রণাম সেরে ভোট দিতে এসেছিলাম। আমরা আদিবাসী মানে আদি বাসিন্দা। আমাদেরও নথি জমা করে প্রমান দিতে হচ্ছে আমরা দেশের বাসিন্দা।" এদিন যেন বাবার শূন্যতা গোটা পরিবারকেই কুরে কুরে খাচ্ছিল। প্রাণীপালন করে সংসার চালানো মৃত দুর্জনের দুটি বিয়ে। দ্বিতীয় স্ত্রী তথা কানাইয়ের মা সবিতা মাঝি বলেন, "আমি আর বৌমা মিলে ভোটের মেশিনের বোতামটা জোরে টিপে সেদিনের বদলা নিয়েছি।"
