ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ক্ষত থেকে যায় শরীরের গভীরে। একটা সিগারেট শেষ হতে সময় লাগে কয়েক মিনিট, অথচ তার প্রভাব স্থায়ী হতে পারে বছরের পর বছর। সেই অদৃশ্য ক্ষতির কথাই প্রতি বছর ৩১ মে বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস (World No Tobacco Day)।
তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছিল বহু আগেই। সেই উদ্বেগ থেকেই শুরু হয় বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের যাত্রা। সময়ের সঙ্গে এটি কেবল একটি দিবস নয়, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষার এক লড়াই। প্রতি বছর নতুন বার্তা, নতুন থিম আর নতুন প্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারিত হয় একই আহ্বান, তামাকমুক্ত হোক পৃথিবী।
আজই ছাড়ুন ধূমপানের সুখটান। ছবি: সংগৃহীত
এক টানে শরীরে ঢোকে বিষ
সিগারেটের আগুনে শুধু তামাক পোড়ে না, পুড়তে থাকে শরীরের সুস্থতাও। ধোঁয়ার সঙ্গে ঢোকা হাজারো রাসায়নিক পদার্থ নিঃশব্দে আক্রমণ করে ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি ও শরীরের নানা অঙ্গকে। ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের মতো রোগের পেছনে অনেক সময়ই থাকে এই ছোট্ট অভ্যাসটির দীর্ঘ ছায়া।
তামাকের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল, এর ক্ষতি সব সময় চোখে পড়ে না। অনেকটা নীরব ঘাতকের মতো এটি ধীরে ধীরে শরীরকে দুর্বল করতে শুরু করে।
শুধু ধূমপায়ী নন, ঝুঁকিতে আশপাশের মানুষও
একজন মানুষ যখন সিগারেটে টান দেন, তখন সেই ধোঁয়ার ভাগীদার হয়ে যান আশপাশের অনেক মানুষও। বাড়ির শিশু, বৃদ্ধ বা গর্ভবতী নারী কারও জন্যই এই ধোঁয়া নিরাপদ নয়। ঘরের কোণে ভেসে থাকা অদৃশ্য ধোঁয়া কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের অসুস্থতার কারণ। তামাকের ক্ষতি ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক সমস্যায় রূপ নেয়।
তামাকে শারীরিক ক্ষতির অন্ত নেই। ছবি: সংগৃহীত
ধোঁয়াবিহীন তামাকও নিরাপদ নয়
অনেকেই মনে করেন জর্দা, গুটখা বা খৈনির মতো ধোঁয়াবিহীন তামাক তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এগুলো মুখগহ্বর, জিভ, মাড়ি, গলা ও খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে দাঁত ও মাড়ির নানা সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
আধুনিকতার মোড়কে নতুন ফাঁদ
সময় বদলেছে, বদলেছে তামাকের রূপও। ই-সিগারেট, ভেপিং ডিভাইস বা বিভিন্ন ফ্লেভারযুক্ত নিকোটিন পণ্যকে অনেক সময় আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, মোড়ক বদলালেও ঝুঁকি কমে না। আসক্তির শেকড় একই থাকে, শুধু তার চেহারা বদলায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে তৈরি এই নতুন বাজার জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তামাক ছাড়ার পথে কীভাবে এগোবেন?
ছাড়ার দিন ঠিক করুন: একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নিয়ে সেদিন থেকেই তামাক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন।
ট্রিগার এড়িয়ে চলুন: চা, কফি, আড্ডা বা এমন পরিস্থিতি এড়ান, যা তামাকের ইচ্ছা বাড়ায়।
ব্যস্ত থাকুন: হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম, বই পড়া বা অন্য কোনও কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্য নিন: আপনার সিদ্ধান্তের কথা কাছের মানুষদের জানান, তাদের সমর্থন নিন।
পর্যাপ্ত জল পান করুন: জল ও স্বাস্থ্যকর খাবার নিকোটিনের আকাঙ্ক্ষা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা কাউন্সেলিং তামাক ছাড়তে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
একবার ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়বেন না: অনেকেরই একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়। প্রতিটি প্রচেষ্টা আপনাকে সাফল্যের আরও কাছে নিয়ে যায়।
ক্ষতি আশপাশের মানুষেরও। ছবি: সংগৃহীত
তামাক ছাড়ার প্রতিটি দিন একটি জয়
তামাক ছাড়া মানে শুধু একটি অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা নয়, বরং নিজের শরীরকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া। ধূমপান বন্ধ করার পর থেকেই শরীর ধীরে ধীরে নিজেকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। শ্বাস নেওয়া সহজ হয়, হৃদ্যন্ত্রের উপর চাপ কমে, ভবিষ্যতের রোগঝুঁকিও হ্রাস পেতে থাকে। এই কারণেই চিকিৎসকেরা বলেন, তামাক ছাড়ার জন্য কোনও দেরি নয়। সিদ্ধান্তটি আজ নিলেও লাভ শুরু হবে আজ থেকেই।
ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকার
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তামাকের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করারও লড়াই। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে শিশুরা ধোঁয়ার মধ্যে নয়, নির্মল বাতাসে বড় হবে; যেখানে একটি সিগারেটের আগুন আর কোনও পরিবারের স্বপ্ন পুড়িয়ে দেবে না।
