তুরস্কের তরুণ টেনিস তারকা জেনেপ সোনমেজ কোর্টে নেমেছিলেন ম্যাচ জিততে। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার আগেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তাঁর একটি ছবি। র্যাকেট হাতে শট নেওয়ার সেই মুহূর্তে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সুগঠিত বাইসেপস, কাঁধের শক্তিশালী পেশি। মুহূর্তেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, কেউ প্রশংসা করেছেন তাঁর ফিটনেসের। আবার অনেকেই জানতে চেয়েছেন, কীভাবে এমন শরীর গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে এই ভাইরাল ছবির আসল গুরুত্ব বাহুর পেশিতে নয়, বরং এমন একটি স্বাস্থ্যবার্তা, যা বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে তুলে ধরছেন। নারীদের ক্ষেত্রে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি শুধু ওজন কমানো নয়, বরং শরীরে পর্যাপ্ত পেশি গড়ে তোলা।
জেনেপ সোনমেজ। লক্ষ্য শুধু ওজন কমানো নয়, পর্যাপ্ত পেশি গড়ে তোলা। ছবি: সংগৃহীত
শুধু রোগা হওয়া নয়, শরীরকে শক্তিশালী করাও জরুরি
দীর্ঘদিন ধরে নারীদের ফিটনেসকে কতগুলো সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ওজন কত, বিএমআই কত, কোমরের মাপ কত, এসবই যেন সুস্থতার প্রধান সূচক। ফলে অনেকেই রোগা হওয়ার জন্য কঠোর ডায়েট, অতিরিক্ত কার্ডিও বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্যালরি কমানোর পথ বেছে নেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ওজন কমলেই যে শরীর সুস্থ হবে, এমন নয়। বরং শরীরে পর্যাপ্ত পেশি থাকাই দীর্ঘসময় সুস্থতার অন্যতম ভিত্তি।
পেশি কেবল শরীরকে শক্তিশালী করে না। এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি জয়েন্টকে সুরক্ষা দেয়, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে, সঠিক অঙ্গবিন্যাসে সাহায্য করে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও কমায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পেশি থেকে মায়োকাইনস নামে কিছু জৈব রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের উপকারিতা শুধু বাহ্যিক নয়, শরীরের ভেতরেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পেশি কেবল শরীরকে শক্তিশালী করে না, রয়েছে আরও উপকার। ছবি: সংগৃহীত
নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে কেন এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাভাবিকভাবেই নারীদের শরীরে পুরুষদের তুলনায় পেশির পরিমাণ কম থাকে। প্রায় ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই ধীরে ধীরে পেশি ক্ষয় শুরু হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সারকোপেনিয়া বলা হয়। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় এই ক্ষয় আরও দ্রুত হতে পারে। এর ফলে অস্টিওপোরোসিস, হাড় ভাঙা, দুর্বলতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টায় অনেক নারী শরীরের প্রয়োজনীয় পেশিও হারিয়ে ফেলেন। খুব কম খাওয়া, অতিরিক্ত কার্ডিও ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন না খাওয়ার ফলে ওজন কমলেও শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এখন চিকিৎসকেরা শুধু ওজন নয়, শরীরে পেশি ও চর্বির অনুপাত বা বডি কম্পোজিশনের উপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ওজন তুললে কি অতিরিক্ত পেশিবহুল হওয়া যায়?
এটি বহুদিনের একটি ভুল ধারণা। বাস্তবে নারীদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। তাই নিয়মিত ওয়েট ট্রেনিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলেও সহজে অতিরিক্ত পেশিবহুল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। বরং এর ফলে শরীর আরও শক্তিশালী হয়, হাড়ের ঘনত্ব বাড়ে, ভারসাম্য উন্নত হয়, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ থাকাও সহজ হয়।
সুস্থ জীবনের লক্ষ্য কেবল ওজন কমানো নয়। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে শুরু করবেন?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত দুদিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা উচিত। জিমে যাওয়াই একমাত্র উপায় নয়। নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে ব্যায়াম, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড, ডাম্বেল বা সাধারণ ওয়েট ট্রেনিং, সবই কার্যকর। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখাও জরুরি।
জেনেপ সোনমেজের ভাইরাল ছবি হয়তো অনেকের নজর কেড়েছে তাঁর শক্তিশালী বাহুর জন্য। কিন্তু ছবিটি আমাদের আরও বড় একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়। সুস্থ জীবনের লক্ষ্য কেবল ওজন কমানো নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শরীর গড়ে তোলা, যা শক্তিশালী, কর্মক্ষম এবং বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারে।
