হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানে মৃত্যুমিছিল নেপালে। সেই ঘটনা ভয় ধরিয়েছে সিকিমেও। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে সিকিমেও একাধিক হিমবাহ গলা জলের হ্রদ রয়েছে। অনেকগুলির অবস্থাই বিপজ্জনক। ওই সমস্ত হ্রদের পরিস্থিতি জানতে নড়েচড়ে বসেছে সিকিম প্রশাসন। গঠন করা হয়েছে বিশেষজ্ঞদের টাস্ক ফোর্স, সিকিম রাজ্য সরকারের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি। ধারাবাহিক নজরদারি এবং যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে হিমবাহ হ্রদের জলস্ফীতিজনিত হড়পা বানের বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে সিকিম সরকার। জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে সুইজারল্যান্ডের ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন সংস্থার সহযোগিতায় দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ এবং শাকো চো-তে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইউগান তামাং জানান, রাজ্য সরকার মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে সাহায্য করছে বিশেষজ্ঞদের টাস্ক ফোর্স। তিনি জানান, হিমবাহ থেকে তৈরি হ্রদ বিপর্যয়ের বিপদ এবং নিচের দিকের জনবসতি ও পরিকাঠামোর উপরে সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে। সিকিম সরকার বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অভিযান শুরু করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোর জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ওই অভিযানের লক্ষ্য।
বন্যায় বিধ্বস্ত নেপাল। ফাইল ছবি।
প্রসঙ্গত, সিকিমে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে ৪০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করেছে রাজ্যের 'ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি'। সেগুলোর মধ্যে সাতটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। সিকিম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সচিব সন্দীপ তাম্বে জানান, হ্রদের গভীরতা, জলের পরিমাণ, হিমবাহ-জনিত অবক্ষেপের (মোরেইন) স্থিতিশীলতা এবং তুষারধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি খতিয়ে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর জন্য বিপদ কমাতে সিকিম তিনটি বড় ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রথমত 'শাকো চু' হ্রদে ভঙ্গুর মোরেইনের আড়ালে প্রায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হয়ে আছে। সৌরচালিত পাম্প ব্যবহার করে হ্রদের জলস্তর ২০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ। হ্রদ থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ ঘনমিটার জল নিষ্কাষণ করা হবে। ফলে মোরেইনটি ভেঙে পড়লে নিচের দিকে নেমে আসা জলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। উত্তর-দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদের ক্ষেত্রে নিচের দিকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে ডোলমা সাম্পাংয়ে পাথর দিয়ে বাধ তৈরির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নিচের দিকের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জল পৌঁছনোর আগে বন্যার তীব্রতা কমিয়ে আনা এই বাধের উদ্দেশ্য হবে। ২০২৩ সালের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে হড়পা বানের তীব্রতা কমাতে ডোলমা সাম্পাংয়ের ৩০০ হেক্টর এলাকা বেশ সহায়তা করেছিল।
২৬ আগস্টের হড়পা বান নেপালের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সিকিম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব ধীরেন গোপাল শ্রেষ্ঠা, প্রধান ইঞ্জিনিয়ার অসীম বাসনেট, বিশেষ সচিব প্রভাকর রাই এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সচিব সন্দীপ তাম্বেও উপস্থিত ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, হিমবাহ থেকে তৈরি হ্রদের জলস্ফীতিজনিত হড়পা বান মোকাবিলায় উন্নত নজরদারি জোরদার করছে সিকিম সরকার। শাকো চু, কেরং এবং ডোলমা সাম্পাং হ্রদে স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়েছে। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর আশেপাশে তুষারধস, ভূমিধস বা অন্যান্য দুর্যোগের কারণ হতে পারে, এমন আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ডপলার আবহাওয়া রাডার বসানো হচ্ছে।
