সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট) প্রথমবার ছিল মে মাসের ৩ তারিখে। ঠিক তার চারদিন আগে, অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল গভীর রাতে রাজস্থানের ঝুনঝুনু বাইপাসে একটি কালো হুন্ডাই ভার্না গাড়ি এসে থামে। সিবিআইয়ের দাবি, ওই গাড়িতে ছিল নিট-ইউজি ২০২৬-এর ফাঁস (NEET Paper Leak Case) হওয়া প্রশ্নপত্রের ১১টি সেট। যে প্রশ্নাবলীর সঠিক উত্তর দিতে দিনরাত এক করে পরিশ্রম করছিল গোটা দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া, পরীক্ষার আগেই হুন্ডাই ভার্নাতে পাচার হচ্ছিল সেই মহার্ঘ প্রশ্ন। টেলিগ্রাম মেসেজ সূত্রে ঝুনঝুনু বাইপাসে এসে গিয়েছিল অমিত কুমার মিনা। রাজস্থানের সিকারা অঞ্চলের কোচিং সেন্টারগুলির থেকে সে তথ্য পেয়েছিল, পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন হাতে আসা সম্ভব।
আজ আর জানতে বাকি নেই। প্রশ্নফাঁস হওয়ার ফলে বাতিল হয়ে যায় ৩ মে-র পরীক্ষা। নতুন করে ২১ জুন পরীক্ষা নেয় ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। সিবিআই চার্জশিট অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের কেন্দ্রবিন্দুতে সিকারের বাসিন্দা মাঙ্গিলাল বিওয়াল ও দীনেশ বিওয়াল। হুন্ডাই ভার্নাতে ছিলেন তাঁরাই। ৩০ এপ্রিল রাতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান— এই তিন বিষয়ের প্রশ্নপত্রের মুদ্রিত সেট লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয় দুই অভিযুক্ত।
জিজ্ঞাসাবাদে অমিত জানিয়েছেন, সিকারে ‘নিট’ প্রস্তুতির সময়েই ঋষি বিওয়ালের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।
যদিও ৩০ এপ্রিল রাতে টাকা ছিল না অমিত কুমার মিনার কাছে। জামানত হিসেবে চারজন পরীক্ষার্থীর দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির মূল মার্কশিট জমা রাখেন মাঙ্গিলাল ও দীনেশের কাছে।
তাঁরাও আশ্বস্ত করেন, মূল প্রশ্নপত্রের ১৫০টির বেশি প্রশ্ন হুবহু মিলে গেলে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হবে। অমিতের বন্ধু রোহিত মাওয়ালিয়া সিকারেতে অবস্থিত দীনেশ বিওয়ালের ছেলে ঋষি বিওয়ালের ফ্ল্যাট থেকে প্রার্থীদের মূল মার্কশিটগুলি সংগ্রহ করেন।
সিবিআই জানিয়েছে, ৩০ এপ্রিল রাতে প্রশ্নপত্র হস্তান্তর হলেও এই চক্রান্তের শুরু কয়েক সপ্তাহ আগে খোদ ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র ভিতরেই। জিজ্ঞাসাবাদে অমিত জানিয়েছেন, সিকারে ‘নিট’ প্রস্তুতির সময়েই ঋষি বিওয়ালের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি জানান, ‘নিট-ইউজি’ ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র জোগাড় করার জন্য ঋষি তাঁকে ১০-১২ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, "ঋষি অমিতকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সে যদি প্রশ্নে কেনার জন্য ১০-১২ জন পরীক্ষার্থী যোগার করতে পারে, তবে তাঁকে বিনামূল্যে প্রশ্ন দেওয়া হবে। আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় সে তার বন্ধু রোহিত মাওয়ালিয়াকে পরীক্ষার্থী জোগাড় করার কাজে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ জানায়।
উল্লেখ্য, শশীকান্ত সুতার নামের এক রসায়ন বিদ্যার শিক্ষক প্রথমবার খেয়াল করেন, পড়ুয়াদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া হচ্ছে একটি প্রশ্নপত্রের, যেটির সঙ্গে মূল প্রশ্নপত্রের প্রচুর মিল রয়েছে। তিনি বিষয়টি জানিয়ে ইমেল করেন এনটিএ-কে। পাশাপাশি রাজস্থান পুলিশকেও বিষয়টি জানান। অভিযোগ করেন, ২০-২৫ লক্ষ টাকায় প্রশ্ন বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও অনুবাদের গোপনীয় প্রক্রিয়ার সময়েই ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত।
রাজস্থান পুলিশের তদন্তের সূত্রেই বিষয়টি নজরে আসে কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রকের। এরপর ১২ মে মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে সিবিআই। বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। একে একে এনটিএ-র বিষয় বিশেষজ্ঞ, মধ্যস্থতাকারী, সুবিধাভোগী এবং পরীক্ষার্থীদের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে। একাধিক রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস করে সিবিআই। চার্জশিটে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও অনুবাদের গোপনীয় প্রক্রিয়ার সময়েই ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত। সিবিআই-এর অভিযোগ, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ পিভি কুলকার্নি, মনীষা মানধারে এবং মনীষা হাভালদার— যাঁদের প্রশ্নপত্রের বিভিন্ন অংশের নাগাল ছিল, তাঁরা চিরকুট ব্যবহার করে, এনসিইআরটি নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ চিহ্নিত করে এবং মুখস্থ করার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছিলেন। যদিও মামলা আদালতে উঠলেও এখনও পর্যন্ত কেউ দোষী সাব্যস্ত হননি।
