shono
Advertisement
Harish Rana

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে দুর্ঘটনা, পক্ষাঘাতে ১৩ বছর বিছানায়! কতটা যন্ত্রণায় ছেলের ‘নিষ্কৃতিমৃত্যু’ চান বাবা-মা?

চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলেন অশোক রানা এবং নির্মলা দেবী। এই অবস্থায় ২০২৪ সালে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁরা। মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে ছেলের জন্য প্যাসিভ ইউথানেসিয়া-র (নিষ্কৃতিমৃত্যু) দাবি জানান। যদিও জীবনযুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে হেরে চলা দু'টি মানুষের ইচ্ছেতে সায় দেয়নি হাই কোর্ট।
Published By: Kishore GhoshPosted: 05:38 PM Mar 11, 2026Updated: 06:15 PM Mar 11, 2026

এই গল্পে বুক ডুকরে কেঁদে উঠবে বেদনাও! দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা তরতাজা মেধাবী একটা ছেলে৷ স্কুলের গণ্ডি পেরনোর পরে ভর্তি হয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে৷ মোহালির চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছিলেন তরুণ৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি মেসে থাকতেন৷ সেই মেসের চার তলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে৷ আঘাত পান মাথায় তরুণ। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। প্রাণে বাঁচলেও কোমায় চলে যান তিনি। বুধবার, ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী বছর বত্রিশের হরিশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। তরুণের নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন করেন তাঁর ৬২ বছরের বাবা অশোক রানা এবং মা নির্মলা দেবী।। সন্তানের মৃত্যুকামনার মতো ভয়ংকর বেদনায় স্তব্ধবাক তাঁরা। এছাড়া উপায় ছিল?

Advertisement

২০১৩ সালের ২০ আগস্ট ছিল রাখিবন্ধনের দিন। সেদিনের দুর্ঘটনায় প্রাণ বাঁচলেও অক্ষম হয়ে পড়েন হরিশ। শরীরের ১০০ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। মাথা থেকে পা— অসাড়। সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। বিছানাই একমাত্র আশ্রয়। ছেলে ভালো করতে কম চেষ্টা করেননি মা-বাবা। এমস, রামমনোহর লোহিয়া, লোকনায়ক এবং দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন তাঁরা। কোনও চিকিৎসাই যন্ত্রণার অন্ধকার থেকে হরিশ বা তাঁর মা-বাবাকে মুক্তি দেয়নি। বরং প্রতিদিন চোখের সামনে নিজের ছেলেকে প্রাণহীন পুতুলের মতো পড়ে থাকতে দেখছেন বৃদ্ধ দম্পতি আর চোখের জল ফেলেছেন। ডাক্তারি পরিভাষায় হরিশের অবস্থা হল 'কোয়াড্রিপ্লেজিয়া' বা ‘পার্সিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’৷

নারকীয় এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না বৃদ্ধ দম্পতি। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলেন অশোক রানা এবং নির্মলা দেবী। এই অবস্থায় ২০২৪ সালে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁরা। মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে ছেলের জন্য প্যাসিভ ইউথানেসিয়া-র (নিষ্কৃতিমৃত্যু) দাবি জানান। যদিও জীবনযুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে হেরে চলা দু'টি মানুষের ইচ্ছেতে সায় দেয়নি হাই কোর্ট। এর পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরিশের বাবা-মা। প্রাথমিক আবেদনে সাড়া দেয়নি সুপ্রিম কোর্টও। যদিও প্রতিবার আদালতে হরিশের বাবা-মা বার্তা দে---যখন বাবা-মা তাঁদের সন্তানের মৃত্যু কামনা করেন, তখন তা নিষ্ঠুরতা নয়। বরং ভালবাসার টানেই ছেলের জীবন শেষ করে দেওয়ার অনুমতি চাইছেন।

অর্থিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়েও আইনি লড়াই চালিয়ে যান অশোক রানা এবং মা নির্মলা দেবী। ছেলের চিকিৎসা চালাতে ২০২১ সালেই নিজেদের তিনতলা বাড়ি বিক্রি করে দেন অশোক। শেষ সম্বল পেনশনের কয়েকটা টাকা। হরিশের ভাই আশিস বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তাঁর চাকরি পাওয়ার পরে সংসারে টানাটানি কিছুটা কমলেও হরিশের চিকিৎসার খরচ চালাতে নাভিশ্বাস উঠছে দম্পতির। এই অবস্থায় ২০২৫ সালে ফের সুপ্রিম কোর্টে হরিশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন করেন বৃদ্ধ দম্পতি। এবারে দু'টি মেডিক্যাল বোর্ডের মতামত শুনে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। সজল চোখে ঐতিহাসিক রায় দেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ।

এদিন নিষ্কৃতিমৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার সময় আবেগঘন বক্তব্যে দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলে, একজন মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার আছে? এই প্রশ্ন মনে পড়ে মার্কিন মন্ত্রী হেনরি ওয়ার্ড বিচারের বিখ্যাত উক্তি—মানুষ জীবন চায় কিনা ঈশ্বর জানতে চায় না। বাধ্যতামূলক গ্রহণ করতে হয়। হরিশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতির বেঞ্চ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর প্রসিদ্ধ ‘টু বি অর নট টু বি’ লাইনটিও উল্লেখ করে। বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার সময় হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রশংসা করেছে। বেঞ্চের মন্তব্য, ‘‘দীর্ঘ ১৩ বছর তাঁরা পুত্রের পাশ থেকে সরেননি। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি- দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার ও সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন হরিশের জন্য মঙ্গলের।’’

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement