উপচে পড়া ভিড়ে 'ট্রাফিক জ্যাম' সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে আট হাজার মিটার উঁচু হিমালয়ের কোলেও! শুধু তাই নয়, আরও অবাক কাণ্ড আবহাওয়া পরিবর্তনের জেরে হিমালয়ের ৭ হাজার মিটার উঁচুতে জলের স্রোত বইছে! ‘ভয়ঙ্কর’ মনে হলেও ২০২৬ এভারেস্ট অভিযান মরশুম শেষে শেরপাদের অভিজ্ঞতা অন্তত এমনটাই। কেন 'ট্রাফিক জ্যাম' হবে না? 'হিমালয়ান ডেটাবেস' এবং নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবার 'প্রি-মনসুন' মরশুমে ১ হাজার ৮ থেকে ১ হাজার ১০ জন পর্বতারোহী এভারেস্ট জয় করেছেন। জানা গিয়েছে, এটাই ছিল সর্বকালীন রেকর্ড। এবারও 'প্রি-মনসুন' এভারেস্ট অভিযান মরশুম শুরু হয়েছে এপ্রিলের শুরুতে। শেষ হয়েছে জুনের প্রথম সপ্তাহে। এই মরশুমে অনেক শেরপা নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভেঙেছেন। যেমন, কামী রিতা শেরপা। তিনি নিজের গড়া ৩২ বার এভারেস্ট আরোহণের রেকর্ড ভেঙেছেন। আরও এক ডজনেরও বেশি গাইড ১৪ থেকে ৩০ বার এভারেস্ট আরোহণ করলেন। এবার ৪৯২ জন বিদেশি পর্বতারোহী অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এর ফলে নেপালের রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.২ মিলিয়ন ডলার।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এবার 'প্রি-মনসুন' মরশুমে ১ হাজার ৮ থেকে ১ হাজার ১০ জন পর্বতারোহী এভারেস্ট জয় করেছেন। জানা গিয়েছে, এটাই ছিল সর্বকালীন রেকর্ড।
কিন্তু হলে কী হবে! এভারেস্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেপালের পারদর্শী শেরপারা রীতিমতো উদ্বিগ্ন। যেমন, শেরপা কামী রিতা সংবাদমাধ্যমকে জানান, গত বছরের তুলনায় এই বছর ভিড় অনেক বেশি ছিল। কর্তৃপক্ষের উচিত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা। সামিট ফোর্সের মাইলস শেরপা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ২১ মে ‘হিলারি স্টেপ’-এ প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বিভিন্ন অভিযাত্রী দলের সদস্যরা শুরু পথটি অতিক্রম করার জন্য নিজেদের পালা আসার অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অত্যধিক ভিড় এবং অধিক উচ্চতায় চলাচলের কঠিন পরিস্থিতির জন্য এলাকাটি পার হতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। সেখানে অল্পের জন্য বড় বিপদ এড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। দড়ি বদলানোর সময় কিছু পর্বতারোহী পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন। অনেকের মধ্যে ক্লান্তি ও উচ্চতাজনিত শারীরিক চাপের লক্ষণ দেখিয়েছে। কার্যত অতিরিক্ত ভিড়, বর্জ্যের ছড়াছড়ি, বেড়ে চলা দূষণ, অনভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও গাইড এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের জেরে হিমবাহের ভঙ্গুর দশা দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শেরপাদের অনেকেই। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, প্রবল ঠাণ্ডাতেও সেখানে বরফ গলতে শুরু করেছে। গড়িয়ে আসছে জলের স্রোত। এই পরিস্থিতিতে এভারেস্টকে নিরাপদ এবং দূষণ মুক্ত রাখতে কঠোর বিধিনিষেধ চালুর দাবি তুলেছেন শেরপারা।
বাণিজ্যিক পর্বতারোহণ শিল্পের দিক থেকে এবারের এভারেস্ট অভিযানের মরশুম ছিল সবচেয়ে সফল। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের জন্য দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ও অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ লাইন, চার নম্বর ক্যাম্প এলাকায় আবর্জনার দূষণ এবং এক শেরপাকে পাহাড়ের 'ডেথ জোন'-এর কাছে অসহায় অবস্থায় ফেলে আসার মতো মর্মান্তিক ঘটনা শেরপাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বলছেনও অনেকে---আর নয়, এবার থামতে হবে।
এই মরশুমে এভারেস্টে সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল ২০ মে। ওইদিন ২৭০ জন পর্বতারোহী পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছে যান। পরের দিন আরও ১৫৪ জন পর্বতারোহী এভারেস্ট জয় করেন। তবে উদ্বেগজনক ঘটনা নেহাত কম ছিল না এবার। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১ জুন। হিলারি দাওয়া নামের এক শেরপাকে ক্যাম্প ৩-এর উপরের কোনও এক জায়গায় ফেলে চলে যান পর্বতারোহীরা। তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়। সাত দিন পর বেস ক্যাম্পের আবর্জনা সংগ্রহকারীরা হিমবাহের উপরে হামাগুড়ি দিয়ে নিজেকে টেনে টেনে নিচে নামতে থাকা এক প্রেতছায়ার মতো অবয়ব দেখতে পায়। তিনি ছিলেন হিলারি দাওয়া। তিনি একাই নিচে নেমে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। এভাবে দাওয়ার বেঁচে ফেরার ঘটনাকে ঘিরে শেরপা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁকে কেন পাহাড়ের একা ফেলে আসা হয়েছে?
