১৯৬৮ সাল। অক্টোবর মাস। ভেনেজুয়েলা সফরে গিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সফর সংক্ষিপ্তই ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার সেই কর্মসূচিই ভারত এবং ভেনেজুয়েলার সম্পর্ককে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছিল। তা টিকেওছে আগামী ৫০ বছর। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে নীতিগত ভাবে নয়াদিল্লির পাশেই দাঁড়িয়েছে কারাকাস (ভেনেজুয়েলার রাজধানী)। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে মার্কিন হানা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনায় নরেন্দ্র মোদির ভারত যে 'সংযত' অবস্থান নিয়েছে, তাতে সেই ভিত খানিক টলে গিয়েছে বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
এশিয়ার মধ্যে প্রথম নয়াদিল্লিতেই দূতাবাস খুলেছিল ভেনেজুয়েলা। ঘটনাচক্রে, তার পরেই দক্ষিণ আমেরিকায় সফর করেন ইন্দিরা। ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া ও ত্রিনিদাদ ঘুরে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছোন তিনি। কারাকাসের সিমন বলিভার মাইকেতিয়া বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, মন্ত্রিসভার সদস্যেরা। ভেনেজুয়েলার গবেষক হার্নান লুসেনা মোলেরো তাঁর গবেষণাপত্রে লিখেছেন, "ইন্দিরা গান্ধীর এই সফরে ভেনেজুয়েলায় উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বিমানবন্দরের রানওয়ে জুড়ে সে দিন দু'দেশের পতাকা উড়েছিল। ওঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মহিলারা।"
বিমানবন্দরে বিশাল জনসমাগম দেখে প্রোটোকলও ভেঙেছিলেন ইন্দিরা! রাস্তার দু'পাশে জড়ো হওয়া মহিলা, শিশুদের থেকে নিজের হাতে ফুল নিতে চেয়ে অনুরোধ করেছিলেন ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাউল লিওনির কাছে। মোলেরো লিখেছেন, "ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভেনেজুয়েলার বহু মানুষকেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তাই সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেখে তাঁরা আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ইন্দিরা গান্ধীও ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তা দেখে।" ইন্দিরাও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট-আয়োজিত নৈশভোজে দু'দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেন (ভেনেজুয়েলা স্পেনের উপনিবেশ ছিল)। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা সংগ্রামী ফ্রান্সিসকো মিরান্ডা, সিমন বলিভার এবং হোসে আন্তোনিওর কথাও তাঁর ভাষণে বলেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, "আমি লাতিন আমেরিকার এবং আমাদের দেশের মধ্যে ভালোবাসার সেতু গড়তে এসেছি।"
ইন্দিরার সফরের পর দু'দেশের সম্পর্ক যে কতটা মজবুত হয়েছিল, তার প্রথম আভাস মেলে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) মুক্তিযুদ্ধের সময়। সেই সময় নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদ, দু'পক্ষই লাতিন আমেরিকার সমর্থন চেয়েছিল। কিন্তু কেউই সেই অর্থে সাড়া দেয়নি। ১৯৭২ সালে কিউবার পর দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দেশ হিসাবে ভেনেজুয়েলাই ভারতের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানায়। বাংলাদেশের সমর্থনে পার্লামেন্টে প্রস্তাবও পাশ করেছিল ভেনেজুয়েলার তৎকালীন সরকার।
এ ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নীতি ও নামিবিয়া দখলের বিরোধিতায় রাষ্ট্রসংঘে একযোগে সরব হয়েছিল ভারত এবং ভেনেজুয়েলা। নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতেও দু'দেশের অবস্থান কার্যত এক ছিল। পরের দশকগুলিতেও তার অন্যথা হয়নি। ২০০৫ সালে ভারতে এসেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ। ২০১২ সালে নয়াদিল্লি এসেছিলেন শাভেজের মন্ত্রিসভার তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী মাদুরোও। ঘটনাচক্রে, সেই মাদুরোকেই অপহরণ করে বন্দি করেছে মার্কিন সেনা।
আন্তর্জাতিক মহলের মত, ভারত এবং ভেনেজুয়েলা বরাবর একযোগে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুর চড়িয়ে এসেছে। আজ ভেনেজুয়েলার দুর্দিনে নয়াদিল্লিরও উচিত ছিল, দীর্ঘদিনের বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করা। কিন্তু তারা তা করেনি। শুধু বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, 'বিষয়টি ভীষণ উদ্বেগের'! এই 'দৃষ্টান্ত' ভবিষ্যতে নয়াদিল্লির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে। নয়াদিল্লির 'বিশ্বাসযোগ্যতা' নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
তবে কেন্দ্রের প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের মত, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে এমনিতেই টানাপড়েন চলছে। যার জেরে ঝুলে রয়েছে দু'দেশের বাণিজ্যচুক্তি। এই পরিস্থিতিতে ভারত প্রকাশ্যে আমেরিকার পদক্ষেপের নিন্দা করলে দু'দেশের সম্পর্কে আরও অবনতি হবে। যা এই মুহূর্তে চাইছে না সাউথ ব্লক। আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এতটাও 'সাদা-কালো' নয়। অনেক বিষয় মাথায় রেখে চলতে হয়। তাই সংযত অবস্থান মানেই বিশ্বাসঘাতকতা নয়। সব কিছুতেই আগে জাতীয় স্বার্থ মাথায় রাখতে হয়। তারপর অন্য সব কিছু।
