কুড়ি-তিরিশে অনিশ্চয়তা। কিন্তু চল্লিশে শান্তি। স্থিতিশীলতা। তখন কাজের অভিজ্ঞতাই আর্থিক নিরাপত্তা দেবে। কর্পোরট দুনিয়ায় কর্মজীবনে এতকাল এটাই ছিল দস্তুর। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে সেই দস্তুরই নিঃশব্দে ভেঙে গিয়েছে। গত দু'-তিন বছরে বিপুল কর্মীছাঁটাই হয়েছে বিভিন্ন কর্পোরেটে। প্রাথমিক ভাবে একে স্রেফ সংস্থার 'কস্ট কাটিং' বলে ভাবা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আদতে তা নয়। লক্ষ্য, সংস্থার খোলনলচেই বদলে ফেলা। কারণ, ছাঁটাইয়ের কবলে পড়েছেন মূলত অভিজ্ঞ, সিনিয়র কর্মীরা, যাঁদের বয়স ৩৫-৫০।
একসময় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের 'মেরুদণ্ড' হিসাবে বিবেচনা করত বিভিন্ন কোম্পানি। তাঁদেরই এখন সংস্থার ব্যালান্স শিটে 'অতিরিক্ত খরচ' হিসাবে দেখা হচ্ছে। অন্তত বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন সংস্থায় গণছাঁটাইয়ের প্রবণতা তেমনটাই বলছে। চাকরির খোঁজ দেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা 'আপনা ডট সিও'-এর কর্ণধার কার্তিক নারায়ণ বলেন, "ভারতের শ্রমবাজারে একটা কাঠামোগত বদল আসছে। সমস্যা আসলে বয়সের নয়। সমস্যা অর্জিত দক্ষতার কার্যকারিতা নিয়ে। এখন মাপকাঠি হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যে কাজটা পারে না, সেই কাজটা আপনি কতটা ভালো করতে পারেন।"
বিশেষজ্ঞদের মত, আসলে মধ্যবয়সি অভিজ্ঞ কর্মীদের সংস্থায় একধরনের প্রভাব থাকে। তাঁরা বেশি বেতন পান। সংস্থার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। আবার ভয় দেখিয়েও তাঁদের দিয়ে কোনও কাজ করানো যায় না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে ২০০-র বেশি সংস্থায় প্রায় এক লক্ষ 'টেক' চাকরি উধাও হয়ে গিয়েছে। তার আগের বছর এই সংখ্যাটাই দেড় লক্ষের বেশি ছিল। সংস্থার তালিকায় রয়েছে— মাইক্রোসফ্ট, মেটা, অ্যামাজন, ওরাকেল, সেলসফোর্স, আইবিএম, অ্যাকসেনচার, ব্লুমবার্গ এবং অ্যাডিডাস। ডিরেক্টর পর্যায়ের পদ থেকে সদ্য ছাঁটাই হওয়া বছর বিয়াল্লিশের এক মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী বলেন, "আমি ভেবেছিলাম, আমার অভিজ্ঞতাই আমার 'সেফটি নেট'। কখনও বলা হয়নি, আমি খারাপ কাজ করছি। শুধু বলা হয়েছিল, সংস্থা ‘রিশেপিং’ (কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস) করছে। পরে বুঝেছি, এটা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। অর্থনীতির প্রশ্ন।"
বিশেষজ্ঞদের মত, আসলে মধ্যবয়সি অভিজ্ঞ কর্মীদের সংস্থায় একধরনের প্রভাব থাকে। তাঁরা বেশি বেতন পান। সংস্থার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। আবার ভয় দেখিয়েও তাঁদের দিয়ে কোনও কাজ করানো যায় না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। আর কর্পোরেট দুনিয়ার শব্দভাণ্ডারে নতুন একটি শব্দ এসেছে -- 'পে রোল কোলেস্টেরল'। অর্থাৎ, একজন সিনিয়র ম্যানেজারের পরিবর্তে চারজন জুনিয়র কর্মীকে নিয়োগ করে বেশি কাজ করানোর কথা ভাবছে সংস্থাগুলি। কার্তিকের কথায়, "বিভিন্ন সংস্থায় মিড-ম্যানেজমেন্টের স্তরই উধাও হয়ে গিয়েছে!" প্রসঙ্গত, সম্প্রতি টিসিএস যে ২ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাঁরা মূলত অভিজ্ঞ এবং মাঝারি স্তরের কর্মী।
চল্লিশের কোঠায় চাকরিহারাদের অনেকের বক্তব্য, এই বয়সে চাকরি যাওয়া মানে গোটা পরিবারই ভেঙে পড়ে। কারণ এই সময়েই সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সবচেয়ে বেশি হয়। মেটাতে হয় ইএমআই-ও। এ ছাড়াও চিকিৎসার খরচ থাকে। ৪৭ বছর বয়সে ছাঁটাই হওয়া এক পিআর ম্যানেজার বলেন, "আমরা প্রতিদিন ব্র্যান্ড ন্যারেটিভ বানাই। কিন্তু বয়স নিয়ে এই ন্যারেটিভটা নির্মম। এত বছরের অভিজ্ঞতার পরও যদি আপনাকে বলা হয়— আপনি রেজিস্ট্যান্ট টু চেঞ্জ, তা হলে খারাপ লাগে।"
