পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা চলে এসেছে ভারতের দুয়ারেও। এই পরিস্থিতিতে রবিবার দেশবাসীকে সংযমী হওয়ার বার্তা দিয়ে একগুচ্ছ আর্জি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একদিকে যেমন করোনাকালের কথা স্মরণ করিয়ে আমজনতাকে বাড়ি থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিদেশযাত্রা কিংবা বিদেশে গিয়ে বিয়ের পরিকল্পনাও আপাতত কাটছাঁট করার আর্জি জানিয়েছেন মোদি। একইসঙ্গে ভোজ্য তেলের ব্যবহার হ্রাস করারও আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। হায়দরাবাদের একটি অনুষ্ঠান থেকে মোদি বলেন, “দেশপ্রেম মানে শুধু সীমান্তে জীবন উৎসর্গ করা নয়। দেশপ্রেম মানে দায়িত্বশীলভাবে জীবনযাপন করা এবং দৈনন্দিন জীবনে দেশের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করা।”
পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার হ্রাস
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমানোর আর্জি জানিয়েছেন মোদি। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে গণপরিবহণ বা মেট্রো ব্যবহারের কথা বলেছেন তিনি। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলকে আগ্রাধিকার দেওয়ার আবেদন প্রধানমন্ত্রীর। অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারেও দেশবাসীকে উৎসাহিত করেছেন তিনি।
যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত। সরকার এখনও পর্যন্ত পেট্রোল, ডিজেল ও মধ্যবিত্তের রান্নার গ্যাসের দাম না বাড়ালেও রিপোর্ট বলছে এর জেরে তেল সংস্থাগুলির প্রতিদিন প্রায় ১,৬০০-১,৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এই অবস্থায় একাধিক সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১৫ মে-র আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে চলেছে সরকার। মোদির বার্তা সেই মূল্যবৃদ্ধির আগাম ইঙ্গিত বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল।
ভোজ্য তেলের ব্যবহার হ্রাস
পেট্রোল-ডিজেলের পাশাপাশি ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমানোরও আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২০২৫-২৬ সালে ভারত ১৯.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভোজ্য তেল আমদানি করেছে। দেশের কোটি কোটি রান্নাঘরে প্রতিদিন ব্যবহৃত এই একটি দ্রব্যের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ হয়। বিপুল পরিমাণ এই আমদানি খরচ হ্রাস করা গেলে তা অর্থনীতির ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে। আর ঘাটতি কমলে টাকার উপর চাপও কমবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ভোজ্য তেলের আমদানিতে আমাদের প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। যদি সমস্ত পরিবার ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনে, তাহলে তা দেশপ্রেমের প্রতি এক বিরাট অবদান হবে। এর ফলে দেশের কোষাগারের উপর যেমন চাপ কমবে, তেমনই দেশবাসীর স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটবে।"
বিদেশ যাত্রাতেও ‘না’
সংকটের পরিস্থিতিতে আগামী এক বছর দেশবাসীকে বিদেশভ্রমণ থেকেও বিরত থাকার আবেদন জানিয়েছেন মোদি। তিনি বলেন, “ইদানিং মধ্যবিত্তদের মধ্যে বিদেশে গিয়ে বিয়ে করা, বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এখন সংকটের সময়ে, অন্তত এক বছরের জন্য আমাদের বিদেশে যাওয়ার ভাবনাকে সরিয়ে রাখতে হবে। ভারতে অনেক জায়গা আছে। ওখানে আপনারা যেতে পারেন। ভারতেও অনেক কিছু করা যায়। বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর যত উপায় আছে, সব আমাদের করতে হবে।”
ওয়ার্ক ফ্রম হোম
রবিবার মোদি তাঁর বার্তায় করোনাকালের কথা স্মরণ করিয়ে আমজনতাকে বাড়ি থেকে কাজ করার (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) পরামর্শ দিয়েছেন। ভারতে মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৫৯ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিস বৈঠক, ব্যবসায়িক আলোচনা যদি ভার্চুয়ালি করা যায়, তাহলে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। মোদি বলেন, "এই বৈশ্বিক সংকটে আমাদের কর্তব্যকে সর্বাগ্রে রেখে আমাদের একটি সংকল্প করতে হবে এবং পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করতে হবে। একটি বড় সংকল্প হল পেট্রোল- ডিজেলের ব্যবহার হ্রাস। তাই আমাদের বাড়ি থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), অনলাইন কনফারেন্স এবং ভার্চুয়াল বৈঠককে আবার অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো
বিদেশী মুুদ্রা ভাণ্ডারের উপর চাপ কমাতে ভারতের কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, "মানুষ যেমন এখন রোগ হলে প্রাকৃতিক নিরাময় খোঁজে, তেমনি আমাদের ধরিত্রী মাকে বাঁচাতে রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এগুলি আমাদের খেতগুলোকে ধ্বংস করছে। রাসায়নিকের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোও একটি শিল্প।" তিনি আরও বলেন, "রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে আমাদের প্রাকৃতিক চাষাবাদের দিকে মনযোগ দেওয়া উচিত। এই ধরনের সার ব্যবহার কমানোর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার আরও সুরক্ষিত হবে।" একইসঙ্গে চাষের খেতে ডিজেলচালিত পাম্পের বদলে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পের ব্যবহার বৃদ্ধিরর উপরও জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সোনা কেনায় নিষেধ
জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি আগামী এক বছর সোনা কিনতে নিষেধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আসলে জ্বালানি তেলের মতোই সোনাও আমদানি করে ভারত। এর জন্য খরচ হয় বিরাট অঙ্কের ডলার। সেই খরচ এখন সমস্ত সীমা ছাড়িয়েছে। অশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করা হয় যেমন, তেমনই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্বর্ণ আমদানিকারক দেশও ভারত। মানুষ যত সোনা কিনবে, তত বেশি করে সোনা আমদানিও বাড়াতে হবে। ফলস্বরূপ আমদানি খরচ সামলাতে অতিরিক্ত ডলার খরচ হবে। কমজোরি হবে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার। এইসঙ্গে ডলার এবং টাকার দামের মধ্যে ব্যবধানও বাড়বে। এর জেরে টাকার দামের পতন হবে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একথা ভেবেই দেশবাসীর সোনা কেনায় রাশ টানতে চাইছেন মোদি।
উল্লেখ্য, ভোট মিটতেই জ্বালানির দাম বাড়ানো শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। প্রথম কোপটা এসেছে বাণিজ্যিক গ্যাসের উপর। ১০০-২০০ টাকা নয়, শুক্রবার একধাক্কায় সিলিন্ডারপিছু ৯৯৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম। এখানেই শেষ নয়, দাম বাড়ানো হয়েছে অটোর এলপিজিরও। একধাক্কায় ৬ টাকা ৪৪ পয়সা দাম বেড়েছে অটোর জ্বালানির। আশঙ্কা করা হচ্ছে এবার কোপ পড়তে পারে জ্বালানি তেল ও মধ্যবিত্তের রান্নার গ্যাসের উপর।
