ছোট বোতাম ফোনেই বাজিমাত সাইবার জালিয়াতদের। পুরনো মডেলের ছোটমাপের বোতাম ফোন ব্যবহার করেই ডিজিটাল গ্রেপ্তারির ভয় দেখিয়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিল সাইবার জালিয়াতরা। এমনকী, শহরের এক প্রবীণ দম্পতি এতটাই ভয় পান যে, সাইবার জালিয়াতদের ‘নির্দেশমতো’ তাঁরা নিজেদের গৃহবন্দি করে রেখে সারাক্ষণ মোবাইল ও ল্যাপটপের ভিডিও চালু করে রাখেন। এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে শেষ পর্যন্ত সাইবার জালিয়াতের ডেরায় পৌঁছন লালবাজারের গোয়েন্দারা। সাইবার জালিয়াতি চক্রের মাথা মহম্মদ আমজাদকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারের সাইবার থানার পুলিশ।
নিউ মার্কেটের মার্কুইস স্ট্রিটে ব্যবসার আড়ালে ডিজিটাল গ্রেপ্তারির মতো সাইবার জালিয়াতি চালাচ্ছিল মহম্মদ আমজাদ। পেমান্টাল স্ট্রিটে তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গোয়েন্দারা উদ্ধার করেন ১৭টি মোবাইল। এর মধ্যে ১৫টি মোবাইলই ছোট বোতাম ফোন। বাকি দু’টি স্মার্টফোন। শহরে বসে রীতিমতো সিমবক্স ব্যবহার করে জালিয়াতি করত আমজাদের চক্র। তার বাড়ি থেকেই ৬টি ৩২ স্লট সিমবক্স, পাঁচটি ১২৮ স্লট সিমবক্স, একটি ২৫৬ স্লট সিমবক্স, একটি ল্যাপটপ, ন’টি রাউটার, ওয়াইফাই চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা, ২ হাজার ২৫০টি ভুয়া সিমকার্ড, আরও কিছু বৈদু্যতিন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও গোয়েন্দাদের মতে, আমজাদের ‘গ্যাং’য়ে রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন সাইবার জালিয়াত।
পুলিশ জানিয়েছে, গত অক্টোবরে এই ঘটনার সূত্রপাত। শহরের এক প্রবীণের কাছে নিজেকে কুরিয়র সংস্থার কর্মী সেজে এক ব্যক্তি প্রথমে তাঁকে ফোন করে। সে বলে, ওই ব্যক্তির নামে একটি পার্সেল এসেছে। ওই পার্সেলের ভিতর বেআইনি সামগ্রী থাকার কারণে সিবিআই ও ইডি এর তদন্ত শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পর অমিত কুমার নামে এক ব্যক্তি নিজেকে সিবিআই আধিকারিক পরিচয় দিয়ে একটি ভিডিও কল করে। নিজের ভুয়া আইকার্ড দেখিয়ে জানায়, অভিযোগকারী ও তাঁর স্ত্রীকে ডিজিটাল গ্রেপ্তারি করা হয়েছে। ওই ভুয়া সিবিআই আধিকারিক ‘নির্দেশ’ দেয়, যেন তাঁরা নিজেদের মোবাইল ও ল্যাপটপের ভিডিও সারাক্ষণ খোলা রাখেন। কারণ, এর মাধ্যমে তাঁদের উপর নজরদারি রাখা হবে। এর পর আরও দু’জন অন্য নম্বর থেকে ওই দম্পতিকে ফোন করে। তাঁদের মধ্যে একজন নিজেকে আইপিএস ও সাইবার ক্রাইম হেড বলে পরিচয় দেয়। অন্য ব্যক্তি পরিচয় দেয় ‘ফিনানসিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স’-এর কর্তা বলে। তাঁরা তাঁদের হোয়াটস অ্যাপে সিবিআই, ইডি, সুপ্রিম কোর্ট, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভুয়া লোগো দেওয়া ভুয়া নথি পাঠায়। এর পর তাঁদের কাছ থেকে জরিমানা হিসাবে তারা টাকা চাইতে থাকে। আতঙ্কে ওই দম্পতি নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা পাঠায়। একটি অ্যাকাউন্টেই ওই টাকা পাঠানো হয়।
গত অক্টোবরে এই ঘটনার সূত্রপাত। শহরের এক প্রবীণের কাছে নিজেকে কুরিয়র সংস্থার কর্মী সেজে এক ব্যক্তি প্রথমে তাঁকে ফোন করে। সে বলে, ওই ব্যক্তির নামে একটি পার্সেল এসেছে। ওই পার্সেলের ভিতর বেআইনি সামগ্রী থাকার কারণে সিবিআই ও ইডি এর তদন্ত শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পর অমিত কুমার নামে এক ব্যক্তি নিজেকে সিবিআই আধিকারিক পরিচয় দিয়ে একটি ভিডিও কল করে।
ক্রমে দম্পতি জানতে পারেন যে, সাইবার জালিয়াতরাই তাঁদের টাকা হাতিয়েছে। এর পরই লালবাজারের সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু করে পুলিশ। মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে গোয়েন্দা আধিকারিকরা তদন্ত শুরু করলেও জালিয়াতরা ছোট ফোন ব্যবহার করার কারণে তাদের ডেরা শনাক্ত করতে সমস্যা হয়। এ ছাড়াও পুলিশের চোখে ধুলো দিতে তারা সিমবক্স ব্যবহার করত। শেষ পর্যন্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও অ্যানড্রয়েড ফোনের সূত্র ধরেই সাইবার জালিয়াতের ডেরায় গোয়েন্দারা হানা দেন।
জানা যায়, কলকাতায় বসেই মার্কুইস স্ট্রিটের দোকানের আড়ালে হচ্ছিল এই সাইবার জালিয়াতি। যেহেতু ওই দম্পতিকে অন্তত চারজন ফোন করেছিল, তই গোয়েন্দাদের ধারণা ধৃত আমজাদ ছাড়াও আরও কয়েকজন রয়েছে তার দলে। ধৃতকে জেরা করে বাকি সাইবার জালিয়াতদের সন্ধান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
