shono
Advertisement

Breaking News

CAG report

৭ লক্ষ কোটির ঘাটতি, স্বাস্থ্যসাথী থেকে যুবশ্রী, তৃণমূল জমানায় সর্বত্র দুর্নীতি! বিস্ফোরক দাবি ক্যাগ রিপোর্টে

তৃণমূল জমানায় কীভাবে দুর্নীতি হয়েছে? বিভিন্ন স্তরে বেনিয়মের অভিযোগ ক্যাগ রিপোর্টে।
Published By: Subhajit MandalPosted: 04:29 PM Jul 26, 2026Updated: 04:29 PM Jul 26, 2026

শনিবার রাজ্য বিধানসভায় পেশ হয়েছে তৃণমূল জমানার পাঁচ বছরের দুর্নীতির হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত ক্যাগ রিপোর্ট। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ এই চার অর্থবর্ষের ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সব মিলিয়ে মোট ২৮টি ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, এই রিপোর্ট দেখলে তৃণমূল আমলে কী কী দুর্নীতি হয়েছে, সেই ছবিটা অনেকটা স্পষ্ট হবে।

Advertisement

বস্তুত তৃণমূল জমানায় বেনিয়ম এবং দুর্নীতির বহু অভিযোগই ওই ক্যাগ রিপোর্টে তোলা হয়েছে। একদিকে যেমন সরকারের খাতায় আয়ব্যয়ের হিসাবে গোলমাল, অন্যদিকে তেমনই প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেনিয়ম এবং দুর্নীতি। সেটা আমফানের ত্রাণ হোক, স্বাস্থ্যসাথীর ত্রাণ হোক বা যুবসাথী প্রকল্পে সুবিধাপ্রাপ্তের সংখ্যা। সব ক্ষেত্রেই কোনও না কোনওভাবে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সিএজি-র ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের স্টেট ফিনান্সেস অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিএসডিপির ২.১৯ শতাংশ। আর্থিক ঘাটতি ছিল ৬১ হাজার ৯২৪ কোটি বা জিএসডিপির ৩.৪১ শতাংশ।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের সিএজি রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভয়াবহ দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেছে। রাজস্ব ঘাটতি ৩৯,৭২৭ কোটি, রাজকোষ ঘাটতি ৬৪,৪৮৮ কোটি এবং রাজ্যের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭.৩৫ লক্ষ কোটিরও বেশি। একই সঙ্গে মূলধনী ব্যয় হ্রাস, সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং কেন্দ্রের অর্থে পরিচালিত একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের পূর্ণ সদ্ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টিও এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত টানা দশ বছর রাজ্য রাজস্ব ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে। শুধু তাই নয় রাজস্বের ৫২ শতাংশই এসেছে কেন্দ্র থেকে। শমীকের অভিযোগ, "তৃণমূল সরকারের আমলে ঋণ বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি। উন্নয়নের ভিত্তি শুধু ঋণ নিয়ে ব্যয় বাড়ানো নয়, প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।"

সিএজি-র ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের স্টেট ফিনান্সেস অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিএসডিপির ২.১৯ শতাংশ। আর্থিক ঘাটতি ছিল ৬১ হাজার ৯২৪ কোটি বা জিএসডিপির ৩.৪১ শতাংশ। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত প্রতিটি অর্থবর্ষেই পশ্চিমবঙ্গে রাজস্বে ঘাটতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই সময় রাজস্ব ব্যয় হয়েছে ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্ব প্রাপ্তির ১১৮.৫৯ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এই ব্যয়ের বড় অংশই বেতন, পেনশন, সুদ-সহ একাধিক জরুরি খাতে গিয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পে ১৯ হাজার ৪৪৪ কোটির ভর্তুকি যোগ হওয়ায় মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ এই দুই খাতেই ব্যয় হয়েছে। যার ফলে পরিকাঠামো বা মূলধনী খাতে সেভাবে খরচই করতে পারেনি সরকার।

২০২০ সালের ২০ মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলে আছড়ে পড়েছিল সুপার সাইক্লোন আমফান। সিএজি’র অডিট নথি অনুযায়ী, ওই ঘূর্ণিঝড়ের পর রাজ্য সরকার ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড থেকে ৩৫ হাজার ১৮ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়েছিল। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, রাজ্য মাত্র ২,৭০৭ হাজার ৭৭ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং সেই অর্থই বরাদ্দ হয়েছিল রাজ্যের জন্য।

বাজেট বাস্তবায়নেও একাধিক অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করেছে সিএজি। ৩ লক্ষ ৯০ হাজার ৬৩৮.০৪ কোটি বরাদ্দ করা হলেও ব্যয় হয়েছে ৩ লক্ষ ১৯ হাজার ৯৭৫.৭৯ কোটি। ফলে ৭০ হাজার ৬৬২.২৫ কোটি বা ১৮.০৯ শতাংশ অর্থ হিসেব অনুযায়ী অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছে। এছাড়া ১৩ হাজার ৪৮৬.৯২ কোটির অতিরিক্ত ব্যয় এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও হাজার হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত পড়ে থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

এই দুর্নীতিগুলি হয়েছে বিভিন্ন স্তরে। ২০২০ সালের ২০ মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলে আছড়ে পড়েছিল সুপার সাইক্লোন আমফান। সিএজি’র অডিট নথি অনুযায়ী, ওই ঘূর্ণিঝড়ের পর রাজ্য সরকার ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড থেকে ৩৫ হাজার ১৮ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়েছিল। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, রাজ্য মাত্র ২,৭০৭ হাজার ৭৭ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং সেই অর্থই বরাদ্দ হয়েছিল রাজ্যের জন্য। আমফানের ত্রাণে বিভিন্ন স্তরে বেনিয়ম দেখা গিয়েছে। ৯,২২৬ উপভোক্তাকে একাধিকবার বাড়ি তৈরির টাকা দেওয়া হয়েছে। যার অঙ্ক ১৮.০৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রের নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে ২১৮.০৪ কোটি টাকা এসডিআরএফে’র বাইরে রাখা হয়েছিল, যার ফলে ৪.৫১ কোটি টাকার সুদের ক্ষতি হয়। ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ে হুগলি এবং পূর্ব মেদিনীপুরে ফসলের ক্ষতির জন্য সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ৪,৬১,০৩১ জনের মধ্যে ১,৭৭৯ জন একাধিকবার সহায়তা পান, যার ফলে ২২.৮৩ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত প্রদান হয়েছে।

এছাড়াও যুবশ্রী প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্যাগ বলছে যেভাবে যুবশ্রীতে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদনকারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাতে নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাপ্রাপ্তই বছরের পর বছর ধরে যুবশ্রীর সুবিধা পাবেন। রাজ্য সরকার যুবশ্রী প্রকল্পের ক্ষেত্রে আবেদন কোনওরকম যাচাইয়ের ব্যবস্থাই করেনি। যার ফলে বিপুল সংখ্যক ভুয়ো আবেদনকারী তালিকায় থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। তাছাড়া একই আবেদনকারীকে বছরের পর বছর ভাতা দেওয়ায়, নতুন আবেদনকারীদের ভাতা পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ৩১টি প্রাইভেট হাসপাতালকে বিধিবহির্ভূতভাবে ‘এমপ্যানেলড’ করা হয়েছিল। এতে অতিরিক্ত খরচ হয় ১৪ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। রাজ্যের মোট ২ কোটি ৪৩লক্ষ পরিবারকে এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৩৮টি হাসপাতালকে নথিভুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬০৫টি হাসপাতাল। ফলে বহু হাসপাতালে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড দেখিয়েও চিকিৎসা পাননি আমজনতা। তাছাড়া বহুক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে বিমা সংস্থাগুলি হাসপাতালগুলিকে সঠিক সময়ে ক্লেইমের টাকা পরিশোধ করছে না। কিন্তু সরকার পদক্ষেপ করেনি। সর্বোপরি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ করেনি সরকার। যার ফলে ২০২০-২২ সালে প্রায় ৭২১ কোটি টাকার ঋণ নেয়। পরে সরকারকে প্রায় ১০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হয়। শুধু স্বাস্থ্যসাথী, যুবশ্রী নয়, জল জীবন, আমফান, পূর্ত দপ্তর, সমগ্র শিক্ষা মিশন, অঙ্গনওয়াড়ির মতো প্রকল্পেরও বহুস্তরীয় দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে ক্যাগ রিপোর্টে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement