কিশোর ঘোষ: বরকত, সালাম, রফিক, জব্বরদের দেশে বাতিল হয়েছে একুশ ফেব্রুয়ারির ছুটি! ১৯৫২ সালের আন্দোলনে ধর্মের ঊর্ধ্বে ভাষার আবেগেই একজোট হয়েছিল বাঙালি। মনে করা হয়, ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের তথা মুক্তিযুদ্ধের বীজ। পদ্মাপাড়ের সেই গৌরবময় ইতিহাসকে মুছতে ষড়যন্ত্র করছে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার! নতুন বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে 'আত্মঘাতী আচরণ' বলছেন অপার বাংলার তিন কৃতী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার এবং সুবোধ সরকার।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষের ছুটির তালিকা থেকে ভাষা দিবসের পাশাপাশি বাদ পড়েছে সরস্বতী পুজো, জন্মাষ্টমী, বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো সংখ্যলঘুদের পার্বণও। এই বিষয়ে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বলেন, "বাংলা ভাষার প্রতি যে আবেগ, ভালোবাসা, যার উপর দাঁড়িয়ে আমরা এখানে উৎসব করি। গোটা পৃথিবীতে যে দিনটিকে মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়, এটা তো বাংলাদেশের অবদান বলেই ধারণা ছিল। নিজেদের সেই অবদানকেই তারা যদি ভুলতে চায়, তারা যদি এখন বাংলা ভাষাকে পরিত্যাগ করে উর্দু শেখে, তাহলে তারা আত্মাঘাতী কাজ করছে।" 'ঘুণপোকা'র লেখকের বক্তব্য হল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলন আসলে আত্মঘাতী আন্দোলন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে এখন একটা আত্মঘাতী আন্দোলন চলছে। হিন্দু পার্বণের ছুটি তারা বাতিল করছে মানে তারা হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশে তো এখনও অনেক হিন্দু থাকেন, তাদের যদি এভাবে বঞ্চিত করা হয়, বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের যদি বঞ্চিত করা হয়, তাহলে সে দেশের ধর্মের ঊর্ধ্বে যে পরিচয় ছিল, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। এই সবই মৌলবাদীদের উত্থান হতে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে যা হচ্ছে আমাদের চোখে তা আত্মঘাতী আচরণ। এর ফলে তাদের মঙ্গল হবে না।"
ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার মনে করেন নিজের ইতিহাসকেই অপমানিত এবং লাঞ্ছিত করছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, "আশঙ্কা ছিলই মুক্তিযুদ্ধের অঙ্কুরে আঘাত পড়বে। বাংলাদেশের বাঙালির মতো আত্মঘাতী সম্প্রদায় সত্যি বলতে আর দেখিনি। পৃথিবীর সামনে নিজেদের অপমানিত করে ওরা সুখী। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ... এত কাণ্ড করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ হল, নিজেদের সেই ইতিহাসকে তারা অপমানিত এবং লাঞ্ছিত করছে। জানি না এরপর তারা ইউনেস্কোর কাছে দাবি করবে কিনা যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটা প্রত্যাহার করুন। প্রায় উলঙ্গ হয়েও যাওয়ার মতো অবস্থা গোটা পৃথিবীর কাছে!" কতকটা আক্ষেপের সুরে পবিত্র সরকার বলেন, "আমি জানি না পাকিস্তানের দাসত্বের দাবি আবার উঠবে কি না। হয়তো বলবে, তোমার ফিরে এসো আমার পাকিস্তানে ভালো ছিলাম, আবার পাকিস্তান হতে চাই। হয়তো আবার দাবি উঠবে, রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সঙ্গীত বর্জন করা হোক। আমরা এপার থেকে মর্মান্তিক বিতৃষ্ণ এবং লজ্জা নিয়ে এই ঘটনাগুলো দেখছি।"
বাংলাদেশের ইতিহাস মোছার চেষ্টা হলেও তাতে সফল হবে না মৌলবাদীরা, মনে করেন কবি সুবোধ সরকার। তিনি বলেন, "একুশের ফেব্রুয়ারি কি মুছে দেওয়া যায়? একাত্তরের আন্দোলন কি মুছে দেওয়া সম্ভব? বাংলা ভাষার জন্য যে আন্দোলন তা কি মোছা যায়? মুজিবর রহমানকে কি মোছা যাবে? এটা কী শুরু করেছে! আমার নতুন যে কবিতার বইটি প্রকাশিত হয়েছে, সেই বইয়ের নাম---'মোছা কি যায় হোয়াইটওয়াশে?' এগুলো হচ্ছে হোয়াইটওয়াশ। হোয়াইটওয়াশ করে কিছু মোছা যায় না। ন্যারেটিভ বদলেও কিছু করা যায় না। মুজিবর রহমনাকে কি ডাকাত প্রমাণ করা সম্ভব? বাংলাদেশে এখন যা চলেছে তা হল বাঙালির অতীত ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা।"
