shono
Advertisement

Breaking News

Mukul Roy

ভুল চালে মাত! বঙ্গ রাজনীতির একদা 'চাণক্য' মুকুলের শেষটা ভালো হল না

বঙ্গ রাজনীতি থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে 'যুগল ভবন'-এর দোতলায় ঘরবন্দী হয়ে কাটল জীবনের বাকি সময়টা।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 08:51 AM Feb 23, 2026Updated: 10:48 AM Feb 23, 2026

ভুল হয়, জীবনে উন্নতির পথে সাফল্যের সিঁড়ির প্রতি ধাপে ছড়ানো থাকে ভুলের পরাগ। তবে উন্নতির শিখরে গিয়ে বোকার মত ভুলের অনেকখানি মূল্য চোকাতে হয়। যা পারেননি বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য। ভুল চালে রাজনৈতিক জীবনের শেষটা ভালো হল না মুকুল রায়ের। বঙ্গ রাজনীতি থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে 'যুগল ভবন'-এর দোতলায় ঘরবন্দী হয়ে কাটল জীবনের বাকি সময়টা। কত অল্প সময়ে বঙ্গ রাজনীতি থেকে কার্যত বিস্মৃত হয়ে গেলেন একদা চাণক্য মুকুল রায় (Mukul Roy)।

Advertisement

তবে বঙ্গ রাজনীতিতে মুকুল রায়ের উত্থান ছিল যে কোনও রাজনৈতিক নেতার কাছে যথেষ্ট ঈষর্ণীয়। ডানপন্থী রাজনীতিতে বাকিদের মতো কংগ্রেসের হাত ধরেই ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসেছিলেন সামনের সারিতে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই কংগ্রেস ছেড়ে চলে আসেন তৃণমূলে। এর পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া থেকে দিল্লির রাজনীতি। মুকুল রায়ের কর্তৃত্ব দেখেছে দেশ। সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিভাবকত্বে রকেটের মতো ছুটেছে তৃণমূল। বঙ্গে বাম সাম্রাজ্যের পতন থেকে দিল্লির মন্ত্রীপদ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই শতক যেন মুকুলের জন্যই সাজিয়ে রেখেছিল 'রাজনীতির ঈশ্বর'। রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে উঠে আসেন তিনি। তাঁর একের পর এক কূটনৈতিক চাল ও দলের বিপুল সাফল্যের জেরে বঙ্গ রাজনীতিতে চাণক্য উপাধি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সেই ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা তো বটেই ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও নিজেদের বীজ বপন করে ঘাসফুল।

২০০৯ সালে ইউপিএ-২ সরকারে নৌপরিবহন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন, এর পর ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেল মন্ত্রক থেকে পদত্যাগ করলে রেল মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হন মুকুল। ২০১২ সালে হন রেলমন্ত্রী।

আড়ে বহরে বঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের আধিপত্য যত বেড়েছিল দলের তরফে পুরস্কৃতও হয়েছেন চাণক্য। ২০০১ সালে জগদ্দল কেন্দ্র থেকে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন তিনি। এর পর ২০০৬ সালে রাজ্যসভার সাংসদ করে তাঁকে সংসদে পাছিয়েছিল দল। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ইউপিএ-২ সরকারে নৌপরিবহন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন, এর পর ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেল মন্ত্রক থেকে পদত্যাগ করলে রেল মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হন মুকুল। এর পর ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী রেলের ভাড়া বাড়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে সরানোর দাবি তোলেন এবং রেল মন্ত্রক দেওয়া হয় মুকুল রায়কে।

উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া থেকে দিল্লির রাজনীতি। মুকুল রায়ের কর্তৃত্ব দেখেছে দেশ। সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিভাবকত্বে রকেটের মতো ছুটেছে তৃণমূল।

তবে মমতা-মুকুল সম্পর্কের অবনতি শুরু সারদা ও নারদার মতো একের পর এক দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পর। অভিযোগ ওঠে, তলে তলে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন মুকুল। এমনকী মুকুলের দায়িত্বে থাকা ত্রিপুরাতে খারাপ ফল হয় তৃণমূলের। দলের তৎকালীন মহাসচিব খোদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে তখন বলতে শোনা গিয়েছিল, 'ত্রিপুরায় যার উপর দায়িত্ব ছিল সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।' এর পর ২০১৭ সালে পাকাপাকিভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে পা রেখেছিলেন মুকুল রায়। রাজনৈতিক জীবনে সাফল্যের চূড়ায় উঠে মুকুলের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে বার বার।

২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অমিত শাহের সঙ্গে মুকুল রায়। ফাইল ছবি

বিজেপি যোগের পর শুরুটা অবশ্য ভালোই ছিল মুকুলের। অভিজ্ঞ মুকুলে দায়িত্ব ছেড়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। ২১-এর নির্বাচনের আগে প্রশ্ন উঠেছিল মুকুল বিহীন তৃণমূলের অস্তিত্ব নিয়ে। তবে ২০২১-এর খারাপ ফল ও বঙ্গ বিজেপির নানান লবির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন একদা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। আসলে রাজনীতির দাবা খেলায় কখনো কখনো মন্ত্রীও ফাঁদে পড়েন। তবে মন্ত্রী কাটা পড়লেও খেলা শেষ হয় না। বঙ্গে বিজেপিকে ক্ষমতা পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যে মুকুল বিজেপিতে এসেছিলেন, লক্ষ্যে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২১ সালের ১১ জুন ফের তৃণমূলে ফেরেন মুকুল। তখন অবশ্য তিনি বিজেপির বিধায়ক। তবে বঙ্গ রাজনীতিতে ততদিনে ভুল চালের জেরে নিজের 'চাণক্য' তকমা হারিয়েছেন মুকুল। একইসঙ্গে হারিয়েছেন বিধানসভায় বিধায়ক মুকুলের বিশ্বাসযোগ্যতাও।

২০২১ সালে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন মুকুলের, উপস্থিত রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি

তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। তাঁর বিধায়কপদ খারিজের মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কলকাতা হাই কোর্ট খারিজের রায় দিলেও সেই সিদ্ধান্তের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

২০২১ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। যুগল ভবনের দোতলায় নিজেকে কার্যত বন্দি করে ফেলেছিলেন মুকুল। দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবিটিসে ভুগছিলেন তিনি। পাশাপাশি, ডিমেনশিয়াও ছিল তাঁর। মাঝেমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হত তাঁকে। সম্প্রতি ভর্তি ছিলেন নিউ টাউনের এক বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার রাতে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হলেন একদা বঙ্গ চাণক্য মুকুল রায়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • ভুল চালে রাজনৈতিক জীবনের শেষটা ভালো হল না মুকুল রায়ের।
  • বঙ্গ রাজনীতি থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে 'যুগল ভবন'-এর দোতলায় ঘরবন্দী হয়ে কাটল জীবনের বাকি সময়টা।
  • কত অল্প সময়ে বঙ্গ রাজনীতি থেকে কার্যত বিস্মৃত হয়ে গেলেন তিনি।
Advertisement