প্রতীক, তহবিলের পর এবার ভবন দখলে যুদ্ধ! শুক্রসন্ধ্যায় ইএম বাইপাসের ধারে তৃণমূল কংগ্রেস কার্যালয়ের 'দখল' নিল ঋতব্রত শিবির। বঙ্গ রাজনীতিতে এক বেনজির অধ্যায় তৈরি করে 'তৃণমূল ভবনে'র গেটে পড়ল 'মমতাহীন' পোস্টার। সেটিতে স্পষ্ট অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে চেয়ারম্যান অরূপ রায়ের নাম। ঝুলল নতুন তালাও। 'বিদ্রোহী' শিবিরের অন্যতম মুখ আখরুজ্জামান আনসারি বলেন, "এই ভবন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের আবেগ। আমরা এখানেই বসব। বাড়িমালিক মণ্টু সাহার সঙ্গে এই মর্মে চুক্তিও সই হয়েছে।" শুধু তাই নয়, নতুন করে কার্যালয়ের দরজায় নতুন তালা লাগানো হয়েছে। গেটের চাবি এখন তাঁদের কাছেই থাকবে। সেই কথাই জানিয়ে দেন আখরুজ্জামান।
এদিন কার্যালয়ের বাইরে নতুন করে দলের পোস্টার ঝোলায় ঋত-শিবির। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি নেই। নেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিও। কেবল চেয়ারপার্সন হিসেবে নাম রয়েছে অরূপ রায়ের। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই তৃণমূলের বেলেঘাটার বিধায়ক তথা কালীঘাট শিবিরের অন্যতম মুখ কুণাল ঘোষ সেখানে হাজির হন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ওই শিবিরের আইটি সেলের প্রধান উপাসনা চৌধুরীও। দরজায় তালা লাগানো বলে কার্যালয়ে ঢুকতে পারেননি কুণাল ও সঙ্গে থাকা লোকজন। কুণাল ঋতব্রত শিবিরকে কটাক্ষ করে এই ঘটনাকে 'দুর্ভাগ্যজনক' বলে জানিয়েছেন। বলেন, "যারা এসেছিলেন, তাঁরা কি নির্দল প্রতীকে জিতেছেন? দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনও কাজ করব না। কর্মীরা কষ্ট পাচ্ছেন। এদিকে এঁরা হোটেল, বিজেপি নেতাদের বাড়ি যাচ্ছেন।" ঘটনাস্থলে প্রগতি ময়দান থানার পুলিশও গিয়ে পৌঁছয়। কার্যত গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। যাতে কোনও ঝামেলা, বিবাদ না হয়, সেদিকে নজর রেখেই নিরাপত্তা আঁটসাঁট করা হয়েছে।
কার্যালয়ের বাইরে ঝোলানো হয়েছে তৃণমূলের নতুন ব্যানার।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ও দলীয় কোষাগার কাদের জিম্মায় থাকবে? তাই নিয়ে কার্যত দুই তরফে দড়ি টানাটানি চলছে। গতকাল, বৃহস্পতিবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের ফুলবেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেন ঋতব্রত-সহ অন্যান্যরা। দিল্লি থেকে ফিরেই এবার বাইপাসের ধারে তৃণমূলের আদি কার্যালয় পৌঁছে গেলেন ঋতব্রতরা। সেখানে বসতেও দেখা গেল তাঁদের। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, "আমরাই তৃণমূল, এটাই আমাদের কার্যালয়।" আগামী কাল, শনিবার থেকেই এই কার্যালয়ে কাজ শুরু হয়ে যাবে। ঋতব্রত শিবির সূত্রে সেই কথা জানা গিয়েছে।
শাসক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে থেকেই বাইপাসের ধারের বাড়িই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের কার্যালয়। ওই অফিসেই আনাগোনা ছিল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের। নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে সর্বদা গমগম করত ওই বাড়ি। বাড়ির মালিক মন্টু সাহা এবং তাঁর ছেলে অমিত সাহার অভিযোগ ছিল, দিনের পর দিন বাড়ি আটকে রেখেছে তৃণমূল! এমনকী তাঁদের ফোনটাও কেউ ধরছে না! বাড়ি ফেরত না পেলে তাঁরা আইনি পথে হাঁটবেন, সেই কথাও জানিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কালীঘাট শিবির' চাপে পড়ল, তেমনই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।
দরজায় ঝোলানো হয়েছে নতুন তালা। নিজস্ব চিত্র
জানা গিয়েছে, এদিন বাইপাসের ধারেই একটি হোটেলে প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের বৈঠক হয় বাড়ির মালিক মন্টু সাহার ছেলে অমিত সাহার সঙ্গে। সেই বৈঠকেরই পরেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান, সন্দীপন সাহা, ফিরহাদ হাকিমদের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। বাইপাসের ধার দিয়ে তাঁরা কোথায় হেঁটে চলেছেন? সেই প্রসঙ্গে ঋতব্রত বলেন, "পথই পথ মিলিয়ে দেয়।" এরপরই দেখা যায়, তৃণমূলের আদি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে পৌঁছন তাঁরা। শুধু তাই নয়, একে একে সেই কার্যালয়ের ভিতর ঢুকে বসেন ঋতব্রত, ফিরহাদরা। তাহলে কি ওই কার্যালয় দখল নিল ঋতব্রত শিবির? সেক্ষেত্রে তাঁরা ফের জানিয়ে দেন, "আমরাই আসল তৃণমূল।" কোষাধ্যক্ষ আখরুজ্জামান আনসারি বলেন, "এই ভবন তৃণমূল কংগ্রেসের আবেগ।" ফিরহাদ হাকিম জানান, "নিজেদের কার্যালইয়েই এসেছি।"
এদিন পুলিশের সঙ্গে কুণাল ঘোষ কথা বলেন। এরপরই তিনি ফের ক্ষোভ উগরে দেন। কুণাল জানান, অন্য কোনও দরজা দিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ সেসব দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। একমাত্র তালা লাগানো দরজা দিয়ে তালা খুলে ঢুকতে হবে। কখনওই তালা ভেঙে তাঁরা ঢুকবেন না। গোটা বিষয়টি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলীয় নেতৃত্বকে জানানো হবে। এই ভবন নিয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মালিকের সঙ্গে তৃণমূলের চুক্তি রয়েছে। সেই কথাও কুণাল জানিয়েছেন।
