জেআইএস নিবেদিত ‘সংবাদ প্রতিদিন’ ‘সরস্বতীর সেরা স্কুল’ প্রতিযোগিতায় শহরের প্রতিটি স্কুলে জোর টক্কর দিতে প্রস্তুত হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীরা। একেক স্কুলে একেক রকম থিম। কেউ কারও থেকে কম নয়। প্রত্যেকেই নিজেদের পুজো ইউনিক করে তুলতে ব্যস্ত। সেই প্রতিযোগিতায় নিজেদের ভাবনা তুলে ধরলেন শহরের চার স্কুলের প্রধান।
মেঘনা ঘোষাল
প্রধান শিক্ষিকা, আদিত্য অ্যাকাডেমি সিনিয়র সেকেন্ডারি
হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেল, ইনস্টাগ্রামে চ্যাটে অভ্যস্ত এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা চিঠির আবেগ, গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শিখুক। তারা জানুক চিঠির ইতিহাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিঠির বিবর্তন, রূপান্তর। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা নেহরুর চিঠির মতো ঐতিহাসিক চিঠির কথা জানুক ছাত্রছাত্রীরা। এই কথা ভেবেই এ বছর আদিত্য অ্যাকাডেমি সিনিয়র সেকেন্ডারি, দমদম স্কুলে বাগদেবীর আরাধনায় থিম করা হয়েছে 'ইংক, উইসডম, প্রেয়ার'স ইন্ডিয়া'স টাইমলেস লেটারস'। একদিকে যেমন চিঠির অবলুপ্তি হতে চলেছে তেমনই সরস্বতী পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হাতেখড়ি রীতিও এই ডিজিটাল যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই হাতেখড়ির স্লেট, চক দিয়ে পড়ুয়ারা সাজাচ্ছে বীণাপাণির মণ্ডপ চত্বর।
কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা নেহরুর চিঠির মতো ঐতিহাসিক চিঠির কথা জানুক ছাত্রছাত্রীরা। এই কথা ভেবেই এ বছর আদিত্য অ্যাকাডেমি সিনিয়র সেকেন্ডারি, দমদম স্কুলে বাগদেবীর আরাধনায় থিম করা হয়েছে 'ইংক, উইসডম, প্রেয়ার'স ইন্ডিয়া'স টাইমলেস লেটারস'।
সংবাদ প্রতিদিন আয়োজিত জেআইএস নিবেদিত 'সরস্বতীর সেরা স্কুল' প্রতিযোগিতায় প্রতি বছরের মতো এবারও অংশগ্রহণ করেছে আমাদের স্কুল। সেরার মুকুট জিততে ভীষণ সিরিয়াসলি সাজানোর কাজ করছে ছাত্রছাত্রীরা। সাসটেনেবল উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন ব্যবহৃত কাগজকে রং করে নানা হাতের কাজ করছে তারা। চিঠির 'লুক' আনার জন্য কফিতে কাগজ ডুবিয়ে শুকিয়ে নিয়ে প্রিন্ট করছে পড়ুয়ারা। কমার্শিয়াল আর্ট বিষয় নিয়ে যে সব ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করছে তাদের সহযোগিতায় অষ্টম থেকে একাদশ শ্রেণির সমস্ত পড়ুয়া এই সৃজনশীলতায় যুক্ত হয়েছে।
পর্ণা সেনগুপ্ত
বাংলা শিক্ষিকা, জি ডি বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশন
রাত পোহালেই শুক্লাপঞ্চমী। ছাত্রছাত্রীদের আপন উৎসব সরস্বতী পুজো। আমাদের পড়ুয়ারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পরামর্শ মতো জোরকদমে পুজোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার আমাদের স্কুল প্রাঙ্গণে ঢুকলে চমকে যাবেন। মনে হবে, খাস কলকাতার বুকে বর্ধমানের কাঠের পুতুল তৈরির জন্য বিখ্যাত নতুন গ্রামে ঢুকে পড়েছেন। বাংলার কৃষ্টি, এই পুতুলের আদলে পড়ুয়া ও আর্ট শিক্ষিকারা বানিয়েছেন অপূর্ব সব পুতুল।
থিম চূড়ান্ত হওয়ার পরেই কারু শিক্ষিকারা বর্ধমানে গিয়ে রীতিমতো রেকি করে এসেছিলেন। খুঁটিয়ে দেখে আসেন কেমন হয় রাজা-রানি পুতুল, প্যাঁচার পুতুল। তাঁদের গাইডেন্সেই প্লাইউডের উপর রং করে নতুন গ্রামের কাঠের পুতুলের আদলে প্রচুর পুতুল তৈরি করেছে ছাত্রছাত্রীরা।
কমললোচনা দেবীমূর্তিও তৈরি করা হচ্ছে সেই পুতুলের ধাঁচেই। থিম চূড়ান্ত হওয়ার পরেই কারু শিক্ষিকারা বর্ধমানে গিয়ে রীতিমতো রেকি করে এসেছিলেন। খুঁটিয়ে দেখে আসেন কেমন হয় রাজা-রানি পুতুল, প্যাঁচার পুতুল। তাঁদের গাইডেন্সেই প্লাইউডের উপর রং করে নতুন গ্রামের কাঠের পুতুলের আদলে প্রচুর পুতুল তৈরি করেছে ছাত্রছাত্রীরা। ঠিক যেমন লাল, নীল, হলুজ, সবুজ উজ্জ্বল রঙের হয় পুতুলগুলো ওরা ঠিক তেমনই প্লাইউডের উপর রং করে শুকিয়ে নিয়েছে। কেউ আবার রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে পুতুলগুলিকে। বাগদেবীর বন্দনা নিছক পুজো তো নয়। ছেলেমেয়েদের মনে শিল্প চেতনা জাগ্রত করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। পুজোর বাজার থেকে জোগাড়ের মুহূর্তগুলো পড়ুয়া-শিক্ষকের সম্পর্ককে আরও মধুর করে তোলে।
দেবিকা বসু
প্রধান শিক্ষিকা, বাগবাজার মাল্টিপারপাস গার্লস স্কুল
বাগবাজার মাল্টিপারপাস গার্লস স্কুলের সারস্বত সাধনায় এবারের ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে বর্ণময় সত্যজিৎ। অপু-দুর্গার রেললাইন ছুটেছে দিক থেকে দিগন্তরে। মানিকের মণিমাণিক্য ঝরে পড়ে সময়ের স্রোতে, ক্যামেরার আনাচে কানাচে ফুটে ওঠে চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী।
আমাদের কচিকাঁচার দল ভূতের রাজার আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত। তাদের রং তুলির ক্যানভাসে কখনও ধরা দেয় পথের পাঁচালী, কখনও বা তাদের তুলি খুঁজে পরশ পাথর। গুপী-বাঘার হাতের তালিতে কল্পনাপ্রবণ মানব হৃদয় পৌঁছে যায় মন্ত্রমিঠাইয়ের দেশে, সঙ্গে থাকে জবর জবর তিন বর।
আমাদের স্কুলের প্রতিটি অলিন্দেও লেগেছে তার ছোঁয়া। আমাদের কচিকাঁচার দল ভূতের রাজার আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত। তাদের রং তুলির ক্যানভাসে কখনও ধরা দেয় পথের পাঁচালী, কখনও বা তাদের তুলি খুঁজে পরশ পাথর। গুপী-বাঘার হাতের তালিতে কল্পনাপ্রবণ মানব হৃদয় পৌঁছে যায় মন্ত্রমিঠাইয়ের দেশে, সঙ্গে থাকে জবর জবর তিন বর। মগনলালের মগজ কিংবা ফেলুদার মগজাস্ত্রের ম্যাজিক, এক অমোঘ জাদুর ছোঁয়ায় মেলে ধরেছে আমাদের কুশীলবরা। বাংলা চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক ভাষা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। আজ এত বছর পরেও সাদা কালো ও আবছা ধূসরতায় মোড়া এই ছবি বিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমী হদয়ের দরবারে আজও সমান অবদান রাখে। রহস্য, রোমাঞ্চে মোড়া নানা বর্ণের সত্যজিৎ সমকালীন, চিরকালীন। ফেলুদা, তোপসে, জটায়ুর জটলায় এবার আমাদের বিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো আরও জমজমাট হয়ে উঠবে। আপনারাও আসুন।
প্রজ্ঞাপারমিতা বসু
বাংলা শিক্ষক, এপিজে স্কুল, সল্টলেক
সংবাদ প্রতিদিন আয়োজিত জেআইএস নিবেদিত 'সরস্বতীর সেরা স্কুল' প্রতিযোগিতায় প্রতি বছরের মতো এবারও অংশগ্রহণ করেছে আমাদের স্কুল। এবার আমাদের পুজোর থিম আলো (তমসো মা জ্যোতির্গময়)।
অন্ধকার থেকে এই সব চেতনার আলো আবার জাগ্রত হোক, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মনে শুভ চিন্তন, মননের বীজ বপন করে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। বাগদেবীর বন্দনায় তাই আমরা তৃতীয় নয়নকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে চেতনার আলোর বিচ্ছুরণকে প্রকাশ করেছি।
দেবী যেখানে অধিষ্ঠান করবেন তার পিছনে একটি চোখ ইনস্টলেশন করেছেন আমাদের আর্ট টিচার। তৃতীয় নয়নের মতো সেই চক্ষু দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণও ঘটবে। আসলে এই থিমের মাধ্যমে আমরা বোঝাতে চাইছি প্রতিটা মানুষের, প্রতিটা ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আছে। তাদের সকলের তৃতীয় নয়ন আছে, আলো আছে। আজকাল মানুষের মনে দয়া, মায়া, শুভচেতনার বড় অভাব দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার থেকে এই সব চেতনার আলো আবার জাগ্রত হোক, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মনে শুভ চিন্তন, মননের বীজ বপন করে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। বাগদেবীর বন্দনায় তাই আমরা তৃতীয় নয়নকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে চেতনার আলোর বিচ্ছুরণকে প্রকাশ করেছি। দেবী হবেন শুভ্রবসনা। তার সঙ্গে মানানসই শোলার সাজ। পুজো, অঞ্জলি, খাওয়াদাওয়া, পড়ুয়াদের সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান, প্রাক্তনীদের পুনর্মিলনে শুক্রবার আনন্দোৎসবের চেহারা নেবে আমাদের স্কুল। এই দিনটিতে প্রতিবারের মতো এবারও বেলা ১২টা নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাঁশি, গান, আলেখ্য, নাচের বর্ণময় এক অনুষ্ঠান করবে ছাত্রছাত্রীরা। অনুষ্ঠানের আগে আমরা বড় স্ক্রিনে একটি ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন দেব। সেখানে দেখানো হবে কীভাবে ব্রহ্মা সরস্বতীকে সৃষ্টি করলেন। কোন উদ্দেশ্যে তাঁকে সৃষ্টি করা হল? যে মহৎ উদ্দেশ্যে বীণাবাদিনীর আবির্ভাব হয়েছিল আজকের দিনে তার গুরুত্ব, বিশেষত্ব কি একই আছে? না কি বদলে যাচ্ছে?
