সালটা ২০০৭। তাঁর লেখা 'দ্বিখণ্ডিত'কে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলা। তৎকালীন বাম সরকারের নির্দেশে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। আজ প্রায় ২০ বছরের নির্বাসন পর্ব কাটিয়ে কলকাতায়, রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিন। আগুনঝরা কণ্ঠে উঠে এল কলকাতা থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা কীভাবে তাঁকে প্রতিমুহূর্তে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বুঝিয়ে দিলেন তিনি কিছুই ভোলেননি। বামেদের আক্রমণ শানিয়ে বললেন, "অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, কারা খুলল।" ধন্যবাদ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। তবে এই কৃতজ্ঞতা যে কোনও আনুগত্য নয়, তাও স্পষ্ট করে দিলেন তসলিমা।
১ আগস্ট, শনিবার। রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তসলিমা নাসরিন। ছবি-পিন্টু প্রধান।
তসলিমা বলেন, "আজ বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে। কিন্তু দুহাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর থেকে আমাকে চলে যেতে হয়েছে, সেই শহরে ফিরে আসার স্বপ্ন আমি এতবছর দেখেছি। আমি জানি চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।"
কলকাতা ফেরা নিশ্চিত হতেই আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। বারবার কলকাতার প্রতি ভালোবাসা উঠে এসেছে তাঁর কথায়। তিনি বলেছেন, এ শহর তাঁর মনের ভিতর ছিল। শুধু আসার উপায় ছিল না। আজ প্রায় ২০ বছর পর রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তসলিমা শোনালেন সেই যন্ত্রণার কাহিনী। বললেন, "আমি কতবার মনে মনে প্রশ্ন করেছি কলকাতাকে, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হল? তবে আজ আমি উত্তর চাইতে আসিনি।" তসলিমা বলেন, "আজ বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে। কিন্তু দুহাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর থেকে আমাকে চলে যেতে হয়েছে, সেই শহরে ফিরে আসার স্বপ্ন আমি এতবছর দেখেছি। আমি জানি চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।" এরপরই তিনি বলেন, "আজকের দরজা খোলা প্রমাণ করে অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে, কারা দরজা বন্ধ করেছিল কারা খুলল।"
বামেদের আচরণের প্রতি তাঁর ক্ষোভ, অভিমান স্পষ্ট তসলিমার এই বক্তব্যেই। যে বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ বলে গর্ববোধ করে, সেই সরকারের আমলেই ২০০৭ সালে প্রিয় কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল তসলিমাকে। কারণ, সেই সময় তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের প্রকাশ ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল কলকাতা। কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর আগুনঝরা কলমের ‘খোঁচা’য় সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে তীব্র অশান্তির পরিবেশ তৈরি হয়। এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি যে তা সামলাতে সেনা নামাতে হয়েছিল। সেসময় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর নিজস্ব বৃত্তের অর্থাৎ বামমনস্ক সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তসলিমা নাসরিনের বইটিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কলকাতা ছাড়তে বলা হয় তাঁকে। যা নিঃসন্দেহে বাংলার সাহিত্য জগতে অন্ধকার অধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর মসনদে থাকলেও তসলিমাকে ফেরানো নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করেননি। ছাব্বিশে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরই তিলোত্তমায় 'ফেরা' হল তসলিমার। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছেন, "যতবার খুশি আপনি আসবেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।" যা নিঃসন্দেহে লেখিকার কাছে এক পরম প্রাপ্তি। প্রাণের শহরে বারবার ফিরে আসার 'ছাড়পত্র'।
