কথা যখন শুরু হচ্ছে, গভীর রাত। সর্বত্র শুধুই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। নিকষ কালো অন্ধকারে সাড়া নেই কাকপক্ষীর! কিন্তু ফোনের এক প্রান্তে থাকা শ্রোতা শুনছেন এক যুবকের বেদনার কথা, লড়াইয়ের কথা! মার্জিত। শান্ত, স্নিগ্ধ। ডায়মন্ড হারবারের মেঠো পথে হেঁটে চলা ছেলেটির ক্ষোভের কথা ঠিকরে বেরোচ্ছে ফের! অন্দরে জমে থাকা একের এক পাথর যেন বলছে বহু কিছু! সাম্প্রতিককালে দ্বিতীয়বার, আলোচনার কেন্দ্রে থাকা সেই প্রতীক উর রহমানের (Pratik Ur Rahaman) মুখোমুখি হল ‘সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল’।
প্রশ্ন: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি ট্রেন্ডিং, কেউ কেউ বলছেন, এই চিঠি ভাইরাল না হলে নাকি আপনি এত জনপ্রিয় কি না বোঝা যেত না! আপনার দলের একাংশ এমন বলছেন, কী বলবেন?
প্রতীক উর রহমান: এটা খুবই যন্ত্রণার। দুঃখের। কষ্টের। যাঁরা নিজের দলের কর্মীদের খোঁজ রাখেন না। কর্মীদের মন বুঝতে পারেন না। তাঁরা হুমায়ুন কবীরের মন বুঝতে যান। এর চেয়ে যন্ত্রণার আর কী হতে পারে!
প্রশ্ন: চিঠি প্রকাশ্যে এল! অভিযোগ জানালেন। চিঠি কে প্রকাশ্যে আনলেন প্রশ্ন তুললেন! কিন্তু রাজ্য কমিটির বৈঠকে আপনার ডাক নেই, কেন? কোথাও গিয়ে কি আপনাকেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হল?
প্রতীক উর রহমান: আমি উত্তর দিলে কেউ কেউ বলবেন, হয়ত অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য এমন বলছি। কিন্তু আমি সত্যিই আশা করেছিলাম, বড্ড বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাকে হয়ত ডাকা হবে। আমার কথা শোনা হবে। কিন্তু ঠিক তার উল্টো হল! আমি নিজে শুনিনি, তবে শুনলাম বৈঠকের পর নাকি বলা হয়েছে, প্রতীক উরের সিদ্ধান্ত প্রতীক উর নেবে! দলের জন্য প্রতীক উর রহমান তো খুন হতেও পারত! একটা চিঠি দেওয়ার কারণে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া হল! এটা শুধুমাত্র একটা প্রতীক উর নয়, এরকম অসংখ্য প্রতীক উর আছে। যাঁদের কথা এখনও শোনা হচ্ছে না। তাঁদের কী হবে? এখনও যদি ঘুম না ভাঙে, কবে ঘুম ভাঙবে?
প্রশ্ন: ডায়মন্ড হারবারের মতো কঠিন লোকসভা আসনে লড়াই। দলের হয়েও প্রচার। দলের হয়ে গলা ফাটানো। সেই দল থেকেই এমন কিছু পাচ্ছেন! খারাপ লাগছে? কষ্ট হচ্ছে?
প্রতীক উর রহমান: কষ্ট তো হচ্ছে। কিন্তু দিনের শেষে আমি দলের সঙ্গে বেইমানি করিনি। বহুবার আমার সাক্ষাৎকার আপনি নিয়েছেন। যতদিন এসএফআই করেছি একশো শতাংশ দিয়েছি। সিপিএম করেছি একশো শতাংশ দিয়েছি। আমার দিক থেকে বেইমানি তকমা নেই। কিন্তু আমার উল্টো দিক থেকে কী হয়েছে না হয়েছে, সেটা সময় বলবে। জনগণ বলবে। বাংলার মানুষ বলবেন।
প্রশ্ন: মাটির নেতা। মাটির টান। কোথাও গিয়ে সংখ্যালঘু মুখ হয়ে ওঠা। দলের মধ্যেই প্রতিযোগী হয়ে ওঠা, এসব কি কাজ করেছে? এই পরিস্থিতি তৈরির নেপথ্যে কি এটাই? ডানা ছেঁটে ফেলার ক্ষেত্রে কোনও চক্রান্ত ছিল?
প্রতীক উর রহমান: জানি না। এটা কোনও দিন ভাবিনি! তবে এখন ভাবতে হচ্ছে। সফিদা, মইনুলদা, রেজ্জাক, সাত্তার, প্রতীক উর, সবটাই কাকতালীয়, নাকি সবটা এক সূত্রে বাঁধা!
আমি উত্তর দিলে কেউ কেউ বলবেন, হয়ত অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য এমন বলছি। কিন্তু আমি সত্যিই আশা করেছিলাম, বড্ড বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাকে হয়ত ডাকা হবে। আমার কথা শোনা হবে। কিন্তু ঠিক তার উল্টো হল!
প্রশ্ন: সিপিএম কবুল করার আগেই তালাক দিয়ে দিল আপনাকে?
প্রতীক উর রহমান: এই বিষয়টি নিয়ে বলতে গেলে, একটা অংশ বলবে হিরো সাজার চেষ্টা, কেউ বলবেন সিম্প্যাথি পাওয়ার জন্য বলছি। একটু আশা করেছিলাম ফোনটা আসবে। উল্টে দেখলাম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিমান বসুর মতো মানুষ সকলের শ্রদ্ধার। তাঁকে মাঠে নামানো হল, সেই খবর মিডিয়াকে দেওয়া হল। আমাকে ডেকে বলতে পারত, তুমি বসে যাও। কিন্তু কীসের এত ষড়যন্ত্র! কেন, ব্যক্তি প্রতিকু উরের (Pratik Ur Rahaman) উপর কেন আক্রমণ! দলের মধ্যে কিছু নেতার অনুগামীদের হয়ে বলিনি বলে কি এই আক্রমণ? কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রশ্ন করতে পারব না? প্রশ্ন করাই কাল হল তাহলে!
প্রশ্ন: দল ছাড়লে গদ্দার, বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে! আপনি যদি অন্য সিদ্ধান্ত নেন, নতুন কিছু যদি করেন? তখন এই অভিযোগ মোকাবিলা করবেন কীভাবে?
প্রতীক উর রহমান: আগে থেকে কিছু ভেবে করা যায় না। রাস্তাতেই আছি। যা করব বলে ভেবেছি সঠিকভাবে করেছি। আমার দলের নেতাদের একটা আফসোস হচ্ছে, চেষ্টা করেও আমার গায়ে গদ্দার তকমা লাগাতে পারছেন না। আমার পোস্টমর্টেম করেও কালি লাগানো যাচ্ছে না, এটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের হচ্ছে কারও কারও!
এই বিষয়টি নিয়ে বলতে গেলে, একটা অংশ বলবে হিরো সাজার চেষ্টা, কেউ বলবেন সিম্প্যাথি পাওয়ার জন্য বলছি। একটু আশা করেছিলাম ফোনটা আসবে। উল্টে দেখলাম ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
প্রশ্ন: দিনের পর দিন আপনার এলাকায় আপনি প্রায় নিষ্ক্রিয়। চরিত্র নিয়েও নাকি কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে! আগে জেনেও মুখ খোলেননি?
প্রতীক উর রহমান: এবার অবশ্যই মুখ খুলব! সবে তো প্রকাশ্যে বলা শুরু করেছি। যে বা যারা করেছে, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে না বললেও মানুষ বুঝতে পারবেন। যা যা আমাদের সঙ্গে হয়েছে।
প্রশ্ন: হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের সাক্ষাৎ, এটা খারাপ লেগেছে?
প্রতীক উর রহমান: ভীষণ খারাপ লেগেছে। শুধু হুমায়ুন কবির নন, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে বসা, এগুলো আমার খারাপ লেগেছে।
প্রশ্ন: আগামীর পদক্ষেপ কী?
প্রতীক উর রহমান: হাঁটতে হাঁটতে চলছি। একটু হাঁটি, বাঁকের ওপাশে ফুল না কাঁটা বিছানো পথ আছে জানি না, কিন্তু একটু এগোই!
