সিপিএম রাজ্য কমিটির 'বিক্ষুব্ধ' সদস্য ও ডায়মন্ডহারবার লোকসভায় ২০২৪ সালের প্রার্থী প্রতীক উর রহমানের সঙ্গে আরও দূরত্ব বাড়ল সিপিএমের। প্রবীণ সিপিএম নেতা বিমান বসুর ডাকেও আলিমুদ্দিনে এলেন না তিনি। এদিকে একটি মহলের আবার দাবি, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ-বিরক্ত প্রতীক খুব শীঘ্রই তৃণমূল কংগ্রেস নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন। সূত্রের খবর, এই শহরেই শাসক দলের একটি মহলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছেন প্রতীক। তাঁকে প্রতিহত করতে এবং দলের মুখরক্ষায় হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান। তাঁকে নিয়ে শ্রদ্ধা থাকলেও সিপিএমের প্রতি যে এই তরুণ নেতা বীতশ্রদ্ধ এবং তার কারণ যে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, তা ঘনিষ্ঠমহলে একপ্রকার স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রতীক।
বুধবার রাতে সংবাদমাধ্যমকে প্রতীক বলেছেন, "বিমানদার সঙ্গে আমার কথোপকথনও পার্টির একাংশ মিডিয়াতে ফাঁস করে দিয়েছে। বৈঠকটি গোপনে হলে যেতাম। আমার পদত্যাগপত্রও রাজ্য কমিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দিই। সেখান থেকে ফাঁস হয়েছে। যাঁরা পার্টির কথা বাইরে আনছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে।” সেলিমকে ইঙ্গিত করে তিনি এদিন বলেন, "সিপিএম আমাকে তিন তালাক দিয়েছে। তবে যাঁরা এটা করেছে তাঁদের রাতের ঘুম হারাম করে দেব। আমি পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নই। রাজনীতি আমি ছাড়ব না।” তৃণমূলে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এই প্রশ্নের উত্তর নেই। একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। এখন একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে অনেক বাঁক। বাঁকের ওপারে খাদ আছে না ফুল বিছানো রাস্তা আছে, তা আমি জানি না। তবে বাঁকটা পার হব।”
সেলিমকে ইঙ্গিত করে তিনি এদিন বলেন, "সিপিএম আমাকে তিন তালাক দিয়েছে। তবে যাঁরা এটা করেছে তাঁদের রাতের ঘুম হারাম করে দেব। আমি পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নই। রাজনীতি আমি ছাড়ব না।”
তরুণ ছাত্রনেতাদের সামনে রেখে এগোতে চায় দলের বড় অংশ, বিমানবাবুও তাঁদের মান্যতা দিতে চান। কিন্তু অভিযোগ, তাঁদের কোণঠাসা করে রাখছেন সেলিম। এমনকী, সেলিম শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক দোষেও দুষ্ট হয়ে পড়েছেন বলে দলের ওই তরুণ অংশের মত। যার দায় দলের ঘাড়েই এসে পড়ছে। যদিও এখনও সিপিএমের একাংশ চাইছে প্রতীক উরের মতো তরতাজা, সক্রিয়, সংখ্যালঘু নেতাকে ছাব্বিশের নির্বাচনী লড়াইয়ে রাখা হোক। মানভঞ্জনে তাই প্রতীককে ফোন করেছিলেন বিমান।
প্রতীক জানান, অচেনা একটি নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে, জানানো হয় বিমানবাবু কথা বলবেন। আলিমুদ্দিনে বৈঠকে বসার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সূত্রের দাবি, প্রতীক সশ্রদ্ধায় বিমানবাবুকে জানান, 'আপনার আদেশ আমি অমান্য করতে পারি না। কিন্তু বর্তমানে যা পরিস্থিতি তাতে আমি আপনার মুখোমুখি হতে পারব না।' ঠিক কী ধরনের 'পরিস্থিতি'! ব্যাখ্যায় ঘনিষ্ঠমহলে তিনি জানিয়েছেন, দলকে নানা ইস্যু নিয়ে জানালেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। দিনের পর দিন একই ঘটনা ঘটেছে। তাই 'আলোচনার পথ' আর মাড়াতে চান না তিনি। প্রতীকের এদিনের বক্তব্য যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। বলেছেন, "আমি পার্টিটা করতে চেয়েছিলাম। তাই দলের অভ্যন্তরে বলেছিলাম বসতে চাই। কিন্তু পার্টির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়া চিঠি প্রকাশ্যে আনা হল। এটা যাঁরা করেছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এবার তো পার্টির প্রার্থীতালিকাও ফাঁস হবে।" দলের 'প্রভাবশালী' বলে কাউকে কাউকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, "যিনি বা যাঁরা এখানে আছেন তাঁরা প্রভাবশালী নেতৃত্ব হতে পারেন। তাঁরা তাঁদের কাছের লোককে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।"
ঘনিষ্ঠমহলে তিনি জানিয়েছেন, দলকে নানা ইস্যু নিয়ে জানালেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। দিনের পর দিন একই ঘটনা ঘটেছে। তাই 'আলোচনার পথ' আর মাড়াতে চান না তিনি।
এর মধ্যেই রাজনৈতিক মহলে চর্চায় এসেছে প্রতীকের সঙ্গে তৃণমূলের একটি যোগসূত্র। সূত্রের খবর, প্রাক্তন ছাত্রনেতা এক তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে প্রতীক ইতিমধ্যে কলকাতায় কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। তৃণমূলে যোগ দেওয়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছে। প্রতীকের ভিতর যে সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে সবরকমভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজে লাগাতে চাইছে তৃণমূল। ওই সূত্রের দাবি, সব ঠিক থাকলে এই তরুণ তুর্কির মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের অন্যতম সৈনিক হয়ে লড়াই সময়ের অপেক্ষা।
এমনকী, এই সূত্রে এসে পড়েছে এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য ও আরেক নেত্রী দীপ্সিতা ধরের নামও। আলিমুদ্দিন সূত্রে আরও খবর, বুধবার পর্যন্ত দীপ্সিতা তাঁর সদস্যপদও নবীকরণ করেননি। তবে এই দুজনের ঘনিষ্ঠমহলের দাবি, প্রতীককে নিয়ে তৃণমূল কতটা কী ভাবছে, তাঁর ভবিতব্য দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ওই দুজন। আর তা যদি কার্যকর হয় তবে ভোটের আগে দলে এত বড় ধস সিপিএমের সামলে ওঠা কঠিন হবে।
এর মধ্যে আজ, বৃহস্পতিবার থেকে দু'দিনের সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক শুরু হচ্ছে। প্রতীককে তাতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। প্রতীক কী সিদ্ধান্ত নেন, তা দেখার জন্য তাঁর কোর্টেই বল ঠেলেছে রাজ্য সম্পাদকের লবি। দলের সদস্যপদ নবীকরণের সময়ের আগেই মাঝপথে কেউ দল ছাড়তে চাইলে তাঁকে বহিষ্কারের সংস্থান গঠনতন্ত্রে আছে। কিন্তু প্রথমেই সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ করলে সিপিএমের বিরুদ্ধে 'অসহিষ্ণুতা'র অভিযোগ উঠতে পারে। তবে যে ইস্তফাপত্র প্রতীক দিয়েছিলেন, তা এখনও গ্রহণ হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে প্রতীককে নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন। বলেছেন, "প্রতীক উরকে ২২ লাখ টাকার গাড়ি দিলে উনি চড়বেন না। ওখানে এখন দুটো শ্রেণি। তার মধ্যে সিপিএমের একটা ফেরেব্বাজ লবি তৈরি হয়েছে। ওরাই সর্বত্র।" দলের অভিজ্ঞদের বক্তব্য, রাজ্য সিপিএমের এখন সেলিমপন্থী আর সুজনপন্থী এই দুই ভাগ। তরুণ প্রজন্মের কিছু নেতা সেলিম ঘনিষ্ঠ, সুজন আবার অনেককে সামনের সারিতে তুলে এনেছেন। কিন্তু সুজনপন্থী তরুণ নেতাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা হচ্ছে বলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পার্টির একাংশের বক্তব্য, মাঠেঘাটে কাজ করা, গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা নেতারা আজ দলে সাইড লাইনে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, সিপিএম পার্টির সঙ্গে জীবনযাত্রা যাদের মেলে না সেরকম কিছু নেতা, যাঁরা ফেসবুকে বেশি সক্রিয়, দল ভাঙিয়ে ইউটিউব চ্যানেল খুলে কামাচ্ছেন, তাঁদেরকে নিয়েই দলে মাতামাতি চলছে। প্রতীক এঁদের উদ্দেশ্য করে এদিন বলেন, দলে সেলিব্রিটি কালচার চলছে।
