ভোটের বাজারে বিক্রি আছে। শুধু মেরুদণ্ড নয়, সওদা তেমন হলে নীতি-আদর্শ-মতবাদও বিকোয় কেজি দরে! দু-চার বছর আগে যিনি বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদিকে অস্পৃশ্যপ্রায় মনে করতেন, এখন সে দলেরই ঝান্ডা হাতে প্রচারে নেমেছেন প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডো দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। বিজেপির টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন উত্তরপাড়া থেকে। এখানেই উঠছে প্রশ্ন। কেন এই ভোলবদল? কীসের লোভে? ব্যালটের বাজারে কীসের মোহে 'আদর্শ' জলাঞ্জলি দিলেন প্রাক্তন কমান্ডো।
অতীতে সোশাল মিডিয়ায় মোদি সরকারকে আক্রমণ করে একাধিক পোস্ট করেছেন দীপাঞ্জন (Dipanjan Chakraborty)। সরাসরি মোদিকে 'প্রতারক' বলেও আক্রমণ করেছেন তিনি। নীতিগতভাবে বিজেপি বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন দীপাঞ্জন। একসময় সোশাল মিডিয়ায় তথাকথিত বিপ্লবীদের একত্রিত হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ কীসের লোভে বা ভয়ে তিনি গেরুয়া শিবিরে নাম লেখালেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আচমকা তাঁর এই ভোলবদলের কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
সম্প্রতি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের হাত ধরে গেরুয়া শিবিরে নাম লেখান দীপাঞ্জন। বুধবার বিজেপির তৃতীয় প্রার্থীতালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, উত্তরপাড়া কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করেছে পদ্মশিবির। এরপরই তাঁর নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রকাশ্যে এসেছে তাঁর পুরনো একাধিক পোস্ট।
তৃণমূলের অভিযোগ, দীপাঞ্জন পেশা ভাঙিয়ে রাজনীতি করতে ময়দানে নেমেছেন। তাঁর কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত তিনি লাগাতার কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে আক্রমণ করেছেন, যা মানুষ দেখেছে। এবার আচমকা তাঁর ভোলবদল হওয়ায় মানুষের কাছে পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
সোশাল মিডিয়ায় দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর করা পোস্ট
এনিয়ে তৃণমূলের মুখপাত্র মৃত্যুঞ্জয় পাল বলেন, "এঁরা নীতির নামে ভেকধারী, সুবিধাবাদী এবং পালটিবাজ। যিনি পুরোপুরি মোদি বিরোধী ছিলেন তিনি কীসের লোভে বিজেপিতে যোগ দিলেন ? এর জবাব মানুষকে দিতে হবে। বাঙালির প্রথম 'ব্ল্যাকক্যাট' ছিলেন কলকাতা পুলিশের অসিত শীল। তিনি শ্রীলঙ্কায় রাজীব গান্ধীকে হামলার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। তিনিও কখনও পেশা ভাঙিয়ে রাজনীতি করতে নামেননি। আর দীপাঞ্জন পেশা ভাঙিয়ে রাজনীতি করতে নেমেছেন।"
মোদিকে বিঁধে বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর পোস্ট।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বিজেপিকে আক্রমণ করে দীপাঞ্জনের বেশকয়েকটি পোস্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি পোস্টে ডেরা প্রধান রাম রহিমকে জেড প্লাস ক্যাটেগরির নিরপত্তা প্রদান করায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তুলোধনা করেছেন তিনি। 'নতুন ভারত' নিয়েও কটাক্ষ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। পোস্টে তিনি দাবি করেছিলেন, এই প্রথম কোনও সরকার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষীকে জেড প্লাস ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দিচ্ছে। অন্য একটি পোস্টে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেঁটে যাচ্ছেন। প্রায় একই রঙের পোশাক পড়ায় মোদি ও শাহকে কটাক্ষ করেছেন তিনি। ছবিটিতে লেখা, যখন শিক্ষক একে অপরের থেকে টুকে লিখতে বারণ করেন। অন্য একটি পোস্টে বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়র একটি মন্তব্য নিয়েও তাঁকে কটাক্ষ করতে দেখা গিয়েছে। কৈলাস বলেছিলেন, বিজেপি অফিসে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে অগ্নিবীরদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১৯৭৭ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দিরা গান্ধির ইস্তফার দাবি উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়েই সেই দাবি ইন্দিরাকে পড়ে শোনাচ্ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি। এই সংক্রান্ত একটি ছবি পোস্ট করে দীপাঞ্জন প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'আজকের ভারতে কি এই দৃশ্য কল্পনা করা যায়?' আর একটি পোস্টে দেখা যাচ্ছে, একটি ছবি পোস্ট করে এক ব্যক্তি 'জয় শ্রী রাম' বলে চিৎকার করছেন আবার তার উলটো দিকে থাকা এক ব্যক্তি শান্ত হয়ে বলছেন 'জয় বাবা ফেলুনাথ'। ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, 'এর থেকে বেশি কিছু বলার নেই, অবশ্য বেশি কিছু বলার ছিলও না।' অন্য একটি পোস্টে মোদিকে 'প্রতারক' প্রধানমন্ত্রী বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে চাঁচাছোলা ভাষায় বিজেপি ও মোদি সরকারকে আক্রমণ করতেন দীপাঞ্জন। কিন্তু আচমকা তাঁর এই নীতি বদল ঘটল কেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই নিয়ে দীপাঞ্জনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
