চিৎপুরের রাস্তায় ট্রামের ঘন্টির টুংটাং শব্দ শোনা যায় না বটে, ট্রামলাইন কিন্তু এখনও আঁকাবাঁকা পাতা রয়েছে। সেই পথের পাশে আট বাই আট থেকে ছয় বাই ছয় অথবা তারও ছোট সব খুপরি ঘর। বাইরে রংচঙে পোস্টার। ভিতরেও যতটুকু জায়গা মেলে তার মধ্যে যে সব আসবাব রাখা, সব ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। পুরনো দিনের রং না করা কাঠ অথবা রেডিমেড স্টিলের টেবিলের উপর পাতা ঘষা মোটা কাচের ভিতরেও গুঁজে রাখা সেই সব রং-চঙে মুখ ভেসে ওঠে। নটী বিনোদিনীর স্মৃতি আঁকড়ে থাকা পাড়ায় এই পয়লা বৈশাখের তপ্ত দুপুরেও সেই সাড়া কোথায়।
রথযাত্রা, অক্ষয় তৃতীয়া এবং বাংলা নতুন বছরের প্রথম শুভদিনে দম ফেলার ফুরসত থাকত না এই পাড়ার। যাত্রাপাড়া বলে কথা! বাংলার লোকশিল্পের আঁতুড়ঘর। কত অভিনেতা ভূমিষ্ঠ হয়েছেন এখানে। কতজনের গর্বিত বিদায় দেখেছে এখানকার আধো অন্ধকার মহড়াঘর।
চিত্তেশ্বরী মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই এলাকা। পুরনো পাড়া। উঠোন। কাঠের পাল্লাওয়ালা জানালা, ফুল ফুল নকশা করা দরজা খুললেই আভিজাত্যের আওয়াজ। উত্তরের টলিপাড়াকে একসময় জনপ্রিয়তায় টেক্কা দেওয়া এই বিনোদনের দুনিয়ায় কে পা রাখেননি। যাঁদের দেখতে গ্রামেগঞ্জে, মফস্সলের প্যান্ডেলে ভিড় উপচে পড়ত। আর টালিগঞ্জ এবং চিৎপুর, দুই পাড়াতেই দাপিয়ে বেড়ানো কিছু মুখ এখন রাজনীতির দুনিয়াতেও। তাঁদের কথা মনে করছে এই পাড়া। প্রয়াত জনপ্রিয় নায়ক তাপস পাল, বর্তমান সাংসদ শতাব্দী রায় অভিনয় করেছেন মঞ্চ এবং ক্যামেরার সামনেও। পাপিয়া অধিকারী, দুলাল লাহিড়ী, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ও দাপিয়েছেন যাত্রাপাড়ায়। তবে নেতা এবং অভিনেতা বলতে তাপস, শতাব্দী, পাপিয়া। উৎপল দত্তও যাত্রাপাড়ায় পা রেখেছিলেন। তিনি অভিনয়ই করেননি, নিজের দল গড়ে নতুন আঙ্গিক ও নির্দেশনায় 'লেভেল'ও 'রস্ট্রাম' ব্যবহার করে যাত্রায় বিপ্লব এনেছিলেন।
এখন টলিস্টারদের দাপট চিৎপুরে কম। রাতের পর রাত জাগা, দূর দূর পরের পালাগানের জন্য পাড়ি দেওয়া দিনের পর দিন, এসবে মানিয়ে নেওয়া মুশকিল। অর্থ কমলেও যাত্রাদলের সংখ্যা বেড়ে এখন অর্ধশতাধিক। সকলের যে খুব ভালো বুকিং হয় তা নয়। কিন্তু নেশা তো! আবার ভালোবাসা, শখও বটে। যেমন পূর্বস্থলীর বিধায়ক, মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। তিনি নিয়মিত যাত্রা করেন। তবে বাণিজ্যিক মঞ্চে নয়। একইভাবে পূর্ব মেদিনীপুরের সভাধিপতি, বিধায়ক উত্তম বারিকও মঞ্চ কাঁপান সামাজিক যাত্রাপালায়। বিবেকের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় তো উচ্চ প্রশংসিত। ওই জেলারই বিধায়ক, মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র একসময় সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। যেমনটা করেছিলেন বাম আমলের দমকল মন্ত্রী প্রতিম চট্টোপাধ্যায়। যাত্রাপাড়ার গরিমা টলিউডের নামী শিল্পীদের অংশগ্রহণে বেড়েছিল কি না সেই বিতর্ক এখনও চলছে। কিন্তু যা নিয়ে বিতর্ক নেই, তা হল বাণিজ্য কমেছে যাত্রাপাড়ার। নববর্ষ বা অক্ষয় তৃতীয়ার ভিড়ভাট্টাহীন চিৎপুর তার প্রমাণ। যাত্রাপাড়ার পরিচিত নাম সমীর সেন বলেন, "আমার তিনটি যাত্রাসংস্থা তো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি। বিশ্বভারতী, আনন্দ ভারতী ও কলকাতা অপেরা বন্ধ। আসলে সকলে তো লাভের মুখ দেখছেন না। কিন্তু খরচ বেড়েই চলেছে। দর্শকও কমছে।" সবমিলিয়ে লোকশিক্ষার অঙ্গ যাত্রার পথ এখন খুবই বন্ধুর। এ বড় সুখের সময় নয়।
ভোট আসে ভোট যায়, যাত্রার 'শেষযাত্রা' ঠেকায় কে?
পূর্বস্থলীর বিধায়ক, মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। তিনি নিয়মিত যাত্রা করেন। তবে বাণিজ্যিক মঞ্চে নয়। একইভাবে পূর্ব মেদিনীপুরের সভাধিপতি, বিধায়ক উত্তম বারিকও মঞ্চ কাঁপান সামাজিক যাত্রাপালায়। বিবেকের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় তো উচ্চ প্রশংসিত।Published By: Jaba SenPosted: 01:24 PM Apr 22, 2026Updated: 01:24 PM Apr 22, 2026
Advertisement
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
হাইলাইটস
Highlights Heading Advertisement
