বিধানসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। অথচ জীবন সিংহ-সহ কামতাপুর স্টেট ডিমান্ড কাউন্সিলের (কেএসডিসি) নেতৃত্ব দিল্লিতে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য। বিভ্রান্ত সংগঠনের কর্মীরা। প্রার্থী ঘোষণা করেও জোট বেঁধে প্রচারে নামতে পারছেন না। ওই পরিস্থিতিতে অপেক্ষায় না থেকে উত্তরের সমতলের ছ'টি জেলায় ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কামতাপুর পিপলস পার্টি (ইউনাইটেড)। মালদহ থেকে কোচবিহার বিভিন্ন আসনে তাঁরা লড়বেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা এবং কথা দিয়ে কথা না রাখার অভিযোগ তুলে প্রচার শুরু হয়েছে। স্বভাবতই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করেছে, এবারও কি উত্তরের রাজবংশী ভোট ভাগের পথে?
বিধানসভা ভোটের নির্ঘন্ট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) সুপ্রিমো জীবন সিংহ রাজবংশী অথবা কামতাপুরী সংগঠনগুলোকে এক ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। গঠন করেছেন কামতাপুর স্টেট ডিমান্ড কাউন্সিল (কেএসডিসি)। সংগঠনের তরফে দ্রুত ঘর গোছানোর কাজও শুরু হয়। উত্তরের বিভিন্ন প্রান্তে শাসক ও বিরোধী দল থেকে প্রচুর মানুষ সংগঠনে যোগ দিতে শুরু করেন। বিশেষত উচ্চ শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংগঠনের জনপ্রিয়তা বেড়ে চলে। শুরু হয় প্রার্থী ঘোষণার পাশাপাশি সমমনোভাপন্ন দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা।
কিন্তু এরই মধ্যে মার্চের শেষ নাগাদ ভোটের মুখে জীবন সিংহকে দিল্লিতে তলব ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়। ১২ জনের প্রতিনিধি দল নিয়ে গত ২৪ মার্চ দিল্লিতে যান জীবন। পরবর্তী অধ্যায় ধোঁয়াশায় ভরা। জানা গিয়েছে, ভোট দোরগোড়ায় চলে এলেও এখনও জীবন ও তাঁর দলবল দিল্লিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কামতাপুর পিপলস পার্টি (ইউনাইটেড) মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলায় ২০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দলের নেতা-কর্মীরা প্রচারে নেমেছেন। স্বভাবতই কামতাপুরী বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক প্রার্থী নিয়ে বিভ্রান্তি বেড়েছে। কামতাপুর পিপলস পার্টির (ইউনাইটেড) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নিখিল রায় বলেন, "কেএসডিসি কেন দিল্লিতে গিয়েছে, সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, জানি না। আমরা এর আগে কয়েকবার দিল্লিতে গিয়েছি, দাবিপত্র পেশ করেছি, বিজেপি নেতৃত্ব লিখিতভাবে দাবি পূরণের আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু ভোট চলে যেতে ফিরেও তাকায়নি।" তিনি জানান, ওই কারণে পৃথক কামতাপুর রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। ভোট প্রচারেও ওই দাবি সামনে রাখা হয়েছে।
কামতাপুর পিপলস পার্টির (ইউনাইটেড) নেতৃত্বের অভিযোগ, পৃথক রাজ্য ও ভাষা স্বীকৃতির দাবিপূরণ ও শান্তি চুক্তির আশ্বাস দিয়ে কেএলও 'চিফ' জীবন সিংহকে আত্মসমর্পণ করানোর পর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কেএলও সুপ্রিমো জীবন সিংহ ছ’জন অনুগামীকে নিয়ে নাগাল্যান্ডের মন জেলার মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া নয়াবস্তি এলাকায় আত্মসমর্পণ করেন। ২০০৩ সালে ভুটান পাহাড়ে 'অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট'-এর পর দু'দশক কখনও বাংলাদেশ, কখনও মায়ানমারের জঙ্গলে কাটিয়েছেন তিনি। তাঁকে দিল্লিতে নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে শান্তি বৈঠকের কথা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে সরকারিভাবে ওই বিষয়ে আজও কিছু জানানো হয়নি। শান্তি বৈঠকের নামে টালবাহানা করে অযথা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলেই মনে করছে কামতাপুর পিপলস পার্টির (ইউনাইটেড) নেতৃত্ব। তারা জানান, সমস্যা সমাধান না-করে ঝুলিয়ে রেখে বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে।
দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বলেন, "এটা চলতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকার যেমন কামতাপুরী আন্দোলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না একইভাবে জীবন সিংহের সঙ্গে শান্তি বৈঠকের বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে।" তিনি জানান, কামতাপুর রাজ্য ও ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে কয়েক দশক থেকে আন্দোলন চলছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার ওই বিষয়ে আলোচনার কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিজেপিও নীরব। অথচ ভোট এলেই প্রলোভন দেওয়া হয়। এবার আর তারা ওই প্রলোভনে পা দিচ্ছেন না।
