পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে দলের আগাগোড়া 'ভুল পলিসি' এবারের ভোটেও বাংলায় বিজেপির নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার হোর্ডিং-বিজ্ঞাপন দিয়েও মণ্ডল সভাপতিদের হাতে লক্ষ লক্ষ টাকা তুলে দিলেও 'পরিবর্তন যাত্রা' ঘিরে কোথাও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ নেই। রাস্তা দিয়ে বিলাসবহুল ভিনরাজ্য থেকে নিয়ে আসা চটকদারি রথ গেলেও বাংলার সাধারণ মানুষ এই যাত্রায় পা মেলাননি। ভিনরাজ্য থেকে বাংলায় বিজেপির 'পরিবর্তন যাত্রা'য় অংশ নিতে আসা দলের হেভিওয়েট নেতারা পৃথকভাবে সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনকে জমা দেওয়া একাধিক গোপন রিপোর্টে একথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলা ফেরত নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, সাংগঠনিক চরম দুর্বলতার পাশাপাশি লোকবল না থাকা সত্ত্বেও কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে পরিবর্তন যাত্রার মতো এমন 'লোক হাসানো' কর্মসূচি নেওয়া হল? জেলাস্তরে কর্মসূচির এই ব্যর্থতার জন্য আদি বিজেপির নেতারা আবার তৎকাল ও নব্য বিজেপির ঘাড়ে দায় চাপিয়ে ভিনরাজ্যের হেভিওয়েট নেতাদের কান ভারী করেছেন। জেলায় জেলায় তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে ভয়ংকর আকার নিয়েছে তা পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নিতে আসা ভিনরাজ্যের নেতারা কার্যত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। দিল্লি থেকে পাঠানো কোটি কোটি টাকা যে কীভাবে নয়ছয় হচ্ছে এবং নেতারা আত্মসাৎ করছেন তা অন্য রাজ্য থেকে আসা হেভিওয়েট নেতাদের সামনে পেয়ে উগরে দিয়েছেন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত বঙ্গ বিজেপির নেতারা। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও পরিসংখ্যান সম্বলিত রিপোর্টে ঠিক কী কী কারণে বাংলায় পরিবর্তনের পরিবর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই চতুর্থবার প্রত্যাবর্তন হচ্ছে তা জানিয়েছেন নীতিন নবীনের টিমের সদস্যরা।
নয়াদিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বিজেপির সদর দপ্তরে জমা পড়া পরিবর্তন যাত্রা সংক্রান্ত রিপোর্টে একের পর এক নেতারা বাংলার গেরুয়া শিবিরের 'আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত'গুলিও উল্লেখ করেছেন। অন্তত সাতটি কারণ দেখানো হয়েছে।
তবে নতুন দায়িত্ব নেওয়া সর্বভারতীয় সভাপতি নবীন এখনই এই নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে রাজি নন। কারণ, তা হলে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে (West Bengal Assembly Election) বাংলায় বিজেপির ব্যর্থতার দায় তাঁর কাঁধেই চাপবে বলে হাত গুটিয়ে রাখছেন তিনি। শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ মহলে 'সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে' বলে আক্ষেপ করে সর্বভারতীয় সভাপতি হতাশার সুরে মন্তব্য করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, দলের ভিনরাজ্যের নেতাদের এই কড়া রিপোর্টের সঙ্গে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বিধানসভা ভিত্তিক গেরুয়া শিবিরের পাঠানো তথ্যও হুবহু মিলে গিয়েছে। বস্তুত সেই কারণে দলের সম্মান বাঁচাতে বাংলার সংগঠনের উপর ভরসা না করে প্রধানমন্ত্রীর ব্রিগেডের সভা ভরানোর জন্য ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ওড়িশা থেকে ১৬ থেকে ১৮টি ট্রেন এবং হাজারখানেক বাস ভর্তি করে গেরুয়া কর্মী-সমর্থক আনার ব্যবস্থা করেছে পদ্ম শিবির।
নয়াদিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বিজেপির সদর দপ্তরে জমা পড়া পরিবর্তন যাত্রা সংক্রান্ত রিপোর্টে একের পর এক নেতারা বাংলার গেরুয়া শিবিরের 'আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত'গুলিও উল্লেখ করেছেন। অন্তত সাতটি কারণ দেখানো হয়েছে। সেগুলি হল -
১) বাংলায় ১০০ দিন ও আবাস যোজনার মতো প্রকল্পে গত চার বছর টাকা বন্ধ করা চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সাধারণ মানুষ বিজেপির এই প্রতিহিংসার রাজনীতি একদম মেনে নেয়নি।
২) বাংলা বললেই বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে পুশব্যাক করা ও ভিনরাজ্যে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের খুনের মতো ঘটনা ভয়ংকর প্রভাব ফেলেছে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্রের মতো প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালিদের নানা সময়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিকৃতভাবে 'অপমান' করার ইস্যু পদ্ম শিবিরকে গভীর খাদে ফেলে দিয়েছে।
৩) বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণ করার চেষ্টা যে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দর বাংলার মানুষ মেনে নেয়নি এবং একাধিক জেলায় হিংসার রাজনীতির চেষ্টা বিজেপি শিবিরে বুমেরাং হয়েছে বলে টের পেয়েছেন পরিবর্তন যাত্রায় আসা ভিনরাজ্যের পোড়খাওয়া গেরুয়া নেতারা।
৪) প্রথম থেকেই বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যের উপর হিন্দি বলয়ের 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পরে মা দুর্গা-মা কালী স্লোগান আঁকড়ে ধরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও তা আদতে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।
৫) দু'বছরের পরিবর্তে মাত্র দু'মাসে এসআইআর করতে গিয়ে বড় সংখ্যায় হিন্দু ভোটাররাই (বিশেষত মতুয়া ও রাজবংশী এবং আদিবাসী) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যা বিজেপি শিবিরে মারাত্মক ধাক্কা দেবে বলে পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নেওয়া নেতারা উপলব্ধি করেছেন।
৬) বঙ্গ বিজেপির নেতাদের চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং বুথ পর্যায়ে সংগঠন নিয়ে প্রচুর জল মেশানো তথ্য পাঠানো।
৭) জনসমর্থন দূরের কথা, জেলা সদরেও ভরসন্ধেবেলায় সভা করতে গিয়ে পরিবর্তন যাত্রায় আসা নেতারা দেখেছেন, হাতে গোনা কিছু পেটোয়া লোকজন ছাড়া কেউ ছিল না।
টাকা খরচ করে ফুল কিনে জমা করলেও বেশ কিছু জায়গায় পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নিতে আসা নেতাদের উদ্দেশে সেই ফুলের পাপড়ি ছড়ানোর লোক পাওয়া যায়নি বলে দীনদয়াল মার্গের অফিসে রিপোর্ট জমা পড়েছে। যেখানে ২৫ হাজার জমায়েত হবে বলে ভিনরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে শ'পাঁচেকের বেশি লোক পাওয়া যায়নি। উলটে অজস্র শূন্য চেয়ার ভিনরাজ্যের ওই নেতাদের ইমেজের ক্ষতি করেছে।
পরিবর্তন যাত্রার এই রিপোর্ট দিল্লির প্রধান কার্যালয়ে জমা পড়ার পর দ্বিতীয়বার আর বাংলায় দলীয় কর্মসূচিতে আসতে চাইছেন না ভিনরাজ্যের একাধিক নেতা। তাঁদের কথায়, ভোটের আগেই তো ওখানে ফল আন্দাজ করা যাচ্ছে - পরিবর্তন নয়, প্রত্যাবর্তন হবে মমতারই।
ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা সামনে রেখে কোচবিহার থেকে রায়দিঘি, বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ভিনরাজ্য থেকে আনা বিলাসবহুল রথ সামনে রেখে 'পরিবর্তন যাত্রা' শুরু করেছিল বিজেপি। টার্গেট ছিল এই রথের উপর থেকে ক্যামেরা তাক করে রাস্তায় জনস্রোত দেখিয়ে তৃণমূল বিরোধী প্রচারে হাওয়া তুলবে। কিন্তু বাস্তবে কোনও জেলা বা শহর-মফস্বলেও পরিবর্তন যাত্রা ঘিরে মানুষের ঢল দূরের কথা, সেভাবে হাতে গোনা গেরুয়া কর্মীদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি বলে ভিনরাজ্যের নেতারা নীতিন নবীনকে রিপোর্ট দিয়েছেন। তথ্য দিতে গিয়ে বর্ধমানের দুর্গাপুরে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর পরিবর্তন যাত্রা শেষে সমাবেশের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ডেকরেটর ৮ হাজার চেয়ার পেতেছিল, কিন্তু বাস্তবে লোক হয়েছিল সাড়ে ছ'শো মতো। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার সভায় আট-ন'শোর বেশি লোক আসেনি বলে আগরতলার বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, বীরভূম এবং হুগলির পরিবর্তন যাত্রার কর্মসূচিতেও যে একদম সাড়া মেলেনি, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ধু-ধু রাস্তা দিয়ে বিলাসবহুল রথ এগিয়ে গিয়েছে তা সর্বভারতীয় সভাপতিকে রিপোর্ট দিয়েছেন বাংলা ফেরত নেতারা।
শুধু তাই নয়, পরিবর্তন যাত্রা দূরের কথা, দলের যে কোনও কর্মসূচির প্রচারে যে বাংলার বিজেপি কর্মীদের একটা বড় অংশের তীব্র অনীহা তা উপলব্ধি করেছেন নীতিন নবীনের নেতৃত্বে চলতে শুরু করা কেন্দ্রীয় বিজেপির সদস্যরা। তাঁরা রিপোর্ট দিয়েছেন, পরিবর্তন যাত্রা নামের এই কর্মসূচির পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। উলটে জলের মতো টাকা খরচ করেও ধারাবাহিকভাবে বাংলাকে বঞ্চনা করা কেন্দ্রীয় সরকারের ইস্যু ফের চাগিয়ে তোলা হয়েছে। বিজেপির নেতাদের এমন পরিকল্পনাহীন পরিবর্তন যাত্রার কর্মসূচি ব্যর্থ হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে বলে রাজধানীর গেরুয়া শিবির সূত্রে খবর। নির্দিষ্ট কয়েকটি আসন ছাড়া অধিকাংশ আসনে আগে যাঁরা পদ্ম প্রতীকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তাঁরা অনেকেই পিছিয়ে যাচ্ছেন বলে কেন্দ্রীয় বিজেপি সূত্রে খবর।
